শোক নয়, চাই হীরন্ময় শক্তির পুর্নজাগরণ
Wednesday, 14th August , 2019, 06:06 pm,BDST
Print Friendly, PDF & Email

শোক নয়, চাই হীরন্ময় শক্তির পুর্নজাগরণ



।।আজিজুল ইসলাম ভুইয়া ।।

আজ ১৫ই আগস্ট। ১৯৭৫ সালের এই দিনের সুবেহ সাদেকের লগ্নে ইতিহাসের চাকা হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়েছিল ধানমন্ডির ৩২ নং রোডের বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে। ঘাতকের কালো মেশিনগানের গর্জনের নিচে মুখ থুবড়ে পড়েছিল মানবতা, মানবসভ্যতা। সপরিবারে নিহত হলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই মর্মন্তুদ ট্র্যাজেডি কেবল বাংলাদেশের কিংবা বাঙালি জাতিরই নয়; এই মর্মান্তিক ঘটনাপ্রবাহ গোটা দুনিয়াকে স্তব্ধ ও বিমূঢ় করে দিয়েছিল। বীরের জাতি বাঙালিদের বিশ্ববাসী চিহ্নিত করেছিল বিশ্বাসঘাতক ও অকৃতজ্ঞ হিসেবে। মুষ্টিমেয় কিছু বিপথগামীর যোগসাজশে আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী ও তাদের এদেশীয় এজেন্ট মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শত্রুরা সমসাময়িক ইতিহাসের এই নিষ্ঠুরতম ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তারা চেষ্টা করেছিল আবহমান বাঙালির লালিত আদর্শ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন চিরতরে ধ্বংস করে দিতে। ঘাতকচক্র চেয়েছিল গোটা দেশকে আত্মপ্রতারণার গিলাব দিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে দিতে। তারা চেয়েছিল ছলচাতুরীর কফিন দিয়ে দাফন করে দিতে আমাদের যা কিছু ইতিহাস, ঐতিহ্য, যা কিছু গর্ব ও গৌরবের সবকিছুকে। এমনকি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথাকেও তারা বিকৃত করতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় নেতাদের চরিত্র হনন করে চেয়েছিল তাদেরকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছ ফেলতে।

আরও পড়ুন-একজন সাংবাদিকেও বেকার করেননি বঙ্গবন্ধু

অন্যদিকে নিরন্তর সচেষ্ট ছিল কিছু খলনায়ককে জাতীয় বীর হিসেবে ইতিহাসে অভিষিক্ত করতে। কিন্তু সে চেষ্টা সফল হয়নি। কারণ মিথ্যা দিয়ে ইতিহাস রচনা করা যায় না। ইতিহাসে মিথ্যার কোনো স্থান নেই, তাই সবার অজান্তে সেসব খলনায়ক নিক্ষিপ্ত হয়েছে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। আজ জাতির পিতাসহ মুক্তিযুদ্ধের বীরসেনানীরা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে মানুষের হৃদয়ের সিংহাসনে। প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে আজ বঙ্গবন্ধু প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন একেকটি স্মৃতিসৌধ হয়ে, একেকটি শহীদ মিনার হয়ে। আর বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে আমরা বিশ্বের দরবারে যে ঘৃণার জন্ম দিয়েছিলাম, কিছুটা হলেও আমরা তা মুছে ফেলতে সক্ষম হয়েছি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে। আমরা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফাঁসির রজ্জুতে ঝোলানোর মধ্য দিয়ে নিষ্কৃতি পেয়েছি দায়বদ্ধতা থেকে। আসছে বছরেই আমরা পালন করব জাতির পিতার জন্ম শতবার্ষিকী। চারদিকে সেই মহোৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। বিশ্ব ইতিহাসে প্রমাণ হবে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু নেই। তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী মহামানব।

আরও পড়ুন-হ্যাঁ, আমরাও পারি আমরাও পারব

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর অনেক দিন পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে ফাঁস হওয়া একটি ডকুমেন্ট পাওয়া গিয়েছিল। সর্বনাশা ১৫ আগস্ট স্ব-পরিবারে জাতির পিতা যখন নিহত হন তখন ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন আমেরিকান অ্যাম্বাসেডর যে টেলিগ্রামটি পাঠিয়েছিল ঐ ডকুমেন্ট ছিল তারই একটি কপি। তাতে লেখা ছিল, ‘The assassination of Sheikh Mujib rendered the new born nation completely leaderless. বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু বাঙালি জাতিকে কি পরিমান নেতৃত্বহীন করেছিল তা বুঝার জন্য আমাদেরকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ডকুমেন্ট পড়ার প্রয়োজন হয় না। ১৯৭১ সনে আমরা যখন মহান মুক্তিযুদ্ধে লিপ্ত তখন বঙ্গবন্ধু ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে আমরা যখন যুদ্ধে লিপ্ত তখন আমাদের বোমারু বিমান ছিল না, আমাদের ট্যাংক ছিল না, কামান ছিল না, যুদ্ধজাহাজ ছিল না। কিন্তু আমাদের জাতির জনক বেঁচে ছিলেন। তিনি লায়ালপুরের জেল প্রকোষ্ঠ থেকে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর সঠিক নির্দেশনায় মাত্র নয় মাসের মধ্যে আমরা পৃথীবির অন্যতম শক্তিশালী ও আধুনিক সেনাবাহীনির দাবিদার পাকিস্তানীদের পরাজীত করে দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলাম। এই জন্যই একজন বিদেশী সাংবাদিক লিখেছিলেন, ‘বন্দি মজিব ছিলেন মুক্ত মজিবের চেয়ে লক্ষগুণ শক্তিশালী’। পাশাপাশি ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আমরা কী দেখতে পেয়েছিলাম ? ঐ সময় আমাদের সমবকিছুই ছিল। পুরো আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। আমাদের মন্ত্রীরা ছিলেন, গভর্নররা ছিলেন, এমপিগণ ছিলেন। আওয়ামী লীগ ছিল, ছাত্রলীগ ছিল, শ্রমিকলীগ ছিল, যুবলীগ ছিল। আমাদের সেনা বাহীনি, নৌবাহীনি, বিমান বাহীনি, রক্ষীবাহীনি, পুলিশ, আনসার, বিডিআর সব কিছুই ছিল। শুধু ছিলেন না জাতির পিতা তাঁর নেতৃত্ব। সেই কারণেই ১৫ আগস্ট আমাদেরকে যুদ্ধ শুরু না হতেই আত্মসমর্পন করতে হলো বিনা যুদ্ধে পরাজয় বরণ করতে হলো।

’৭৫-এর পট পরিবর্তনের অন্তত ২১ বছর ধরে আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি কি নিদারুন ট্রাজেডির মধ্য দিয়ে জাতিকে পথ চলতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে যে ঘাতকচক্র রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেছিল তারা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করেছে ইতিহাসের চাকাকে পিছনে ফিরিয়ে দিতে। ইতিহাসকে সাময়িকভাবে থমকে দেয়া যায় কিন্তু কখনও পিছনে নেয়া যায় না। তাই যদি হত তবে পৃথীবিতে বীরের জন্ম হত না পৃথীবিতে বিপ্লব হত না, পৃথীবিতে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ হত না। আমাদের সৌভাগ্য বঙ্গবন্ধু মরে যাওয়ার পর এই জতির হাল ধরেছিল জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা শুধু বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরসূরী ছিলেন না তিনি ছিলেন জাতির জনকের আদর্শের সঠিক ও স্বার্থক উত্তরসূরীও। সৌভাগ্যক্রমে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের তথা জতির হাল ধরেছিলেন বলেই অন্তত একুশ বছর পর হলেও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে সক্ষম হয়েছিল। শেখ হাসিনার অবর্তমানে গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িক ও মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের চিন্তা চেতনা সমৃদ্ব জনগোষ্ঠি কখনো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেত কি না তা নিশ্চিত ছিল না।

আরও পড়ুন-বজ্র আঁটুনি যেন ফসকা গেরো না হয়

আজ জাতির জনকের যোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা জাতির সেবায় নিয়োজিত। বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে বলেছিলে, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। বঙ্গবন্ধু আমাদেরকে স্বাধীনতা এনে দিয়ে গেছেন কিন্তু মুক্তির সংগ্রাম পরিচালনার দায়িত্ব রেখে গেছেন তাঁর প্রিয় কন্যার জন্য। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সেই অভিষ্ট মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছেন রূপকল্প’২১ ও উন্নত বাংলাদেশ’৪১। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনের সুবর্ণজয়ন্তী পালনের লক্ষ্যে জাতি আজ সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আমাদেরকে পথ চলতে হবে কঠিন সতর্কতার সঙ্গে। স্বাধীনতার পরপরই একজন বিদেশী সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট-কে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বঙ্গবন্ধুকে যখন জিজ্ঞাসা করেছিলেন “What is your best quality?” বঙ্গবন্ধু উত্তর দিয়েছিলেন “I love my people.” আবার যখন বঙ্গবন্ধুর কাছে যানতে চাওয়া হল, “What is your worst quality.” বঙ্গবন্ধু স্বহাস্যে উত্তর দিয়েছিলেন “I love them too much.” বঙ্গবন্ধুর এই কথার মর্মার্থ্য আমাদের চেতনায় ধারন করতে হবে। জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হৃদয় দিয়ে বঙ্গবন্ধুর লালিত আদর্শকে ধারণ করতে হবে। তাঁকে অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে জাতির পিতার মৃত্যুতে যে নেতৃত্ব শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল আজ তা অনেকটাই পূরণ হয়েছে। তবে বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে আমরা আমাদের অবিভাবককেও হারিয়েছি। সফল নেতৃত্ব প্রদানের পাশাপাশি জননেত্রী শেখ হাসিনাকে জাতির অবিভাবকত্ত¡ প্রদান করতে হবে, বঙ্গবন্ধুর মতই মানুষকে ভালোবসতে হবে। একই সঙ্গে সতর্ক থাকতে হবে ভালোবাসার পথ গলিয়ে যাতে কোনো হিংস্র ও সার্থংগৃধু মহল প্রবেশ করতে না পারে। জাতির মর্ম মূলে হিংস্র ছোবল হানতে না পারে, রক্তক্ষরণ করতে না পারে, যেমনটি তারা করেছিল বঙ্গবন্ধুর বেলায়। আজ বঙ্গবন্ধুর শাহাদাত বার্ষিকীতে আমাদের সূর্য শপথ হবে জাতির জনকের স্বপ্ন সোনার বাংলা আমরা গড়ে তুলবই। আজ আমরা বিলাপ করবো না, আজ আমাদের শোকের দিনও নয়। আজ আমাদের হিরণময় শপথ নেয়ার দিন। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ চেতনা বাস্তবায়ন ও লাখ শহীদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের অগ্নি শপথের ক্ষণ।

সর্বশেষ সংবাদ

Print Friendly, PDF & Email

মতামত দিন

 

মতামত দিন

পেপার কর্ণার
Lastnewsbd.com
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন >
আর্কাইভ
মতামত
১৫ আগস্ট: নেপথ্য জানতে কমিশন চাই
।।মনজুরুল আহসান বুলবুল।। দাবিটি অনেক দিনের। বি...
বিস্তারিত
সাক্ষাৎকার
সফল হওয়ার গল্প, সাফল্যের পথ
।।আলীমুজ্জামান হারুন।। ১৯৮১ সালে যখন নিটল মটরসের য...
বিস্তারিত
জেলার খবর
Rangpur

    রংপুরের খবর

  • বোদায় বঙ্গমাতার জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা ও সেলাই মেশিন বিতরণ
  • বঙ্গমাতার জন্মদিন: ঠাকুরগাঁওয়ে দুস্থ ও অসহায়দের সেলাই মেশিন প্রদান
  • করোনায় আক্রান্ত এমপি এমএ মতিন

[page_polls]