কোনটি 'প্রকৃত' আর কোনটি 'সাজানো বা ভেজাল' ধর্ষণ ?
Wednesday, 7th June , 2017, 10:03 pm,BDST
Print Friendly, PDF & Email

কোনটি ‘প্রকৃত’ আর কোনটি ‘সাজানো বা ভেজাল’ ধর্ষণ ?



।।ফাতেমা বেগম ।।

ধর্ষণ নিয়ে প্রচুর চর্চা হচ্ছে। কোনটি ‘প্রকৃত ধর্ষণ’ আর কোনটি ‘সাজানো বা ভেজাল ধর্ষণ’, সেই বিষয়ে বিতর্ক চলছে। অন্য কোন অপরাধের সত্যতা এবং ভেজাল নিয়ে এত বিতর্ক হতে দেখি নাই। ভালো দিক হলো, যেভাবেই হোক না কেন, একটি লজ্জার বিষয়, একটি লুকানোর বিষয় হিসাবে ধর্ষণ নামক সামাজিক অপরাধটি একটি প্রকাশ্য বিষয়ের দিকে এগোচ্ছে।

সচেতনতা তৈরীর জন্য এটি একটি ইতিবাচক দিক। যে কোন সমস্যার সমাধানের জন্য সমস্যা প্রকাশিত হওয়া, প্রচারিত হওয়া, আলোচিত হওয়া একটি পূর্বশর্ত। তবে আশংকার দিক হচ্ছে, এমনিতেই ধর্ষণের সুবিচার পাওয়ার দৃষ্টান্ত বিরল। অভিধানে ‘ভেজাল ধর্ষণ’ যোগ হলে ধর্ষকদের বা ধর্ষকপক্ষদের জন্য আরও স্বস্তির ব্যাপার হতে পারে। এই বিতর্কে মনে হচ্ছে মিথ্যা মিথ্যা ধর্ষণের অভিযোগ করতে নারীদের জন্য সামাজিক ক্ষতির আর কোন ভয় নেই।

সমাজ-ত্যাজ্য হওয়ার অলিখিত আইনটি যেন শিথিল হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে নারীর সতীত্বকে শীর্ষস্থানে রাখা এই সমাজে হঠাৎ করে সতীত্ব হারানোর বিষয় নিয়ে নারীর কোন পরোয়া নেই। সমাজ কি প্রগতিশীলতার চুড়ান্ত শিখরে পৌছে যাচ্ছে? তাহলে এটা আরেকটা ভালো খবর! এখানে আরেকটি প্রশ্ন জাগে। ভেজাল ধর্ষণের মামলাগুলি কাদের স্বার্থে এবং কাদের উদ্যোগে করা হয়? তারা কি পুরুষ? নারীদের অগ্রগামী ভূমিকা অনেক সময় পুরুষদের মধ্য বিদ্যমান প্রতিযোগিতার একটি হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার হয়। এই হাতিয়ার হতে পারে ব্যবসায়িক, বা রাজনৈতিক বা আইনগত। নারীরা এইভাবে যে পন্যে পরিণত হয় তার নাম হয়ে যায় নারীর স্বাধীনতা,এবং অগ্রগামীতা।

এই লিখাটির মূল প্রশ্নগুলি হলো দেশে-বিদেশে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের সংখ্যা আসলে কতটুকু প্রকাশিত হয়? ধর্ষণের আওতা কতটুকু? ধর্ষণ কি শুধু বালিকা এবং নারীদের ক্ষেত্রেই ঘটে? প্রশ্নগুলি অবশ্য গবেষণার দাবি রাখে।
ইচ্ছার বিরুদ্ধে শারীরিক মিলনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাধ্য করলেই তা ধর্ষণ হবে। এই ‘ইচ্ছার বিরুদ্ধে’ হতে পারে বলপ্রয়োগ বা প্রভাব খাটানো বা পরিস্থিতির সুযোগ নেয়া। এই সংজ্ঞার আওতায় একজন স্ত্রীও ধর্ষিতা হতে পারেন, একজন পতিত বা পতিতাও ধর্ষিতা হতে পারেন। প্রভাবের জোরে আপাতঃদৃষ্টিতে স্বেচ্ছায় অংশগ্রহনকারী একজনও আসলে ধর্ষিত বা ধর্ষিতা হিসাবেই বিবেচিত হবেন।
শুধু ধর্ষিতা নয়, ধর্ষিতদের বিষয়টিও প্রাসঙ্গিক করতে। কারণ ধর্ষণ শুধু নারীদের ক্ষেত্রেই নয়, পুরুষদের ক্ষেত্রেও হয়। পৃথিবীতে বিভিন্ন সেক্সুয়ালিটির মানুষ রয়েছে। একজন ধর্ষক কোন সেক্সুয়ালিটিতে পড়বে তার উপর নির্ভর করবে সে কোন লিঙ্গের, কোন বয়সের মানুষকে ধর্ষণ করতে চেষ্টা করবে। সেই বিচারে নারী,এবং পুরুষ উভয়ই ধর্ষক হতে পারেন, উভয়ই ধর্ষকের শিকার হতে পারেন। কিশোর, তরুণ বয়সে এমনকি পরিণত বয়সেও পুরুষরা ধর্ষণের শিকার হয়। সেখানেও ধর্ষক হয় পুরুষ, এবং কখনও নারী।

পরিসংখ্যানে দেখা যায় বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, আবাসিক হল, জেলখানা, কর্মক্ষেত্রে এবং পারিবারিক বিভিন্ন সম্পর্কে এই ধরণের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। তবে ধর্ষণের প্রকৃত পরিসংখ্যান অধিকাংশই এখনও অজানা। যেহেতু সমাজের সংজ্ঞায় পুরুষদের সতীত্ব হারানোর কিছু নেই, এবং যেহেতু পুরুষদের সšন্তানসম্ভব হওয়ার আশংকা নেই তাই এই বিষয়গুলি একটি গোপন অধ্যায় হিসাবেই থেকে যায়।
তবে বিভিন্ন ডকুমেন্টারিতে দেখেছি ধর্ষিত হওয়া পুরুষ সারাজীবন একটা দুঃস্বপ্ন বয়ে বেড়ায়। কারণ ধর্ষণ শুধু শারীরিক নির্যাতন নয়, এটি একটি পরীক্ষিত মানসিক নির্যাতনও। আবার জোরপূর্বক বিক্রির মাধ্যমে যখন তাদেরকে যৌনকাজে ব্যবহার করা হয়, তা অবশ্যই ধর্ষণ। মানবপাচারে নারী, শিশু, কিশোরী, তরুণীদের সাথে বালকরাও অন্তর্ভুক্ত থাকে। কিছু দেশে বালকদের দেহ ব্যবসার সামাজিক বৈধতা রয়েছে। সেই সব দেশে দরিদ্র পরিবারের বালকদের কেনা বেচা হয়। তাদের নাচ শেখানো হয় এবং বিনোদনের উপকরণ বানানো হয়।সমাজের ধনিক শ্রেনীর মালিকানাধীন এই সব বালকদের জীবন থাকে দাসের মত এবং তাদের জীবনের নিরাপত্তা থাকে না। আর তাতে কিছু যায় আসে না।

তবে তুলনামূলক বিচারে নারীরাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্ষণের শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক ক্ষতির চুড়ান্ত মূল্য দিয়ে থাকেন। কারণ সামাজিকভাবে একজন ধর্ষিতা নারীর গ্রহনযোগ্যতা নেই, আর নারীকে ধর্ষণের শারীরিক ফলাফল বয়ে নিয়ে বেড়াতে হয়। প্রাকৃতিক কারণে ধর্ষণ প্রক্রিয়ায় ধর্ষক হিসাবে পুরুষ একটি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে। সতীত্বের সংজ্ঞায় সমাজ পুরুষদের অন্তর্ভুক্ত করে না। তাই অপরাধ না করেও সমাজের দৃষ্টিতে ধর্ষিতা নারী তার সতীত্ব হারিয়ে ফেলে। সামাজিক চরিত্রের প্রভাবে এই সতীত্ব হারানোকে সে নিজেও জীবনের সকল মূল্য হারানো মনে করে, এবং এই কারণে কেউ কেউ আত্মহত্যা করে বা আত্মহত্যার চেষ্টা করে। বেঁচে থাকলেও ধর্ষণের অভিজ্ঞতায় আক্রান্ত নারী একজন অপরাধী এবং মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষ হিসাবে জীবনপাত করে। কারোর চিরস্থায়ী শারীরিক ক্ষতিও হতে পারে। অযাচিত সন্তান সম্ভবা হতে পারে। কিন্তু ধর্ষকের এই সব কোন ক্ষতিই হয় না। তাই ধর্ষকের মনে ধর্ষণ পরবর্তী কোন দুশ্চিন্তা কাজ করে না।

‘খারাপ মেয়েদের ধর্ষণ করা যায়’ এরকম একটি গভীর সামাজিক মূল্যবোধ আমাদের সমাজের মত সমাজগুলি বহন করে চলে। ‘খারাপ মেয়েদের ধর্ষণ করা যায়’ এই মূল্যবোধ প্রকারন্তরে ধর্ষকদের সাহায্য করা হয়। ধর্ষিতাকে খারাপ মেয়ে হিসাবে প্রমাণ করার চেষ্টা অবিরত থাকে। আইনও সেখানে পরাজিত হতে হয়। আবার অসম শক্তির সম্পর্কে নিরাপত্তার ভয়ে এবং ব্যক্তিত্বের দুর্বল অবস্থার কারণে আপাতদৃষ্টিতে স্বেচ্ছা-মিলন হলেও তা ধর্ষণ পর্যায়ে পড়ে যায়। পেশাগত জীবনে এই ধরণের ঘটনা ঘটতে পারে।

ধর্ষণ বরাবর ছিল। নারীরা যখন অন্তরমহলে সুরক্ষিত ছিল, তখনও ধর্ষণ ছিল। বর্তমান বিশ্বের যে সব রাষ্ট্রে নারীদের সুরক্ষিত রাখার জন্য সবধরণের আবরণের বাধ্যতা রয়েছে, সেখানেও ধর্ষণ হয়। মিডিয়ার বিবর্তনে আমাদের মনে হয় আজকাল ধর্ষণ বেড়ে গেছে, এবং তার মূলে রয়েছে নারীদের বাইরে ঘুরাঘুরি এবং অপর্যাপ্ত শারীরিক আবরণ। ধর্ষণ অপরাধ এখন যেন সবার কাছে উন্মোচিত হচ্ছে। তারপরও প্রশ্ন থেকে যায় এই উন্মোচন মোট ধর্ষণের কত অংশ?
তারানা হালিমসহ কারো কারোর মতে, আদালতে ধর্ষন মামলার অধিকাংশই সাজানো মামলা। হ্যা, তা হতে পারে। যেমন হয় অন্য সব অপরাধের সাজানো মামলা। তবে প্রশ্ন হলো, ধর্ষণের শিকার হয় এরকম কতজন আসলে মামলা করে? কতজন নারী বা তার পরিবার ধর্ষণের মামলা করার মত সাহস রাখে? কারণ অন্যান্য অপরাধের সাথে ধর্ষণ অপরাধের পার্থক্য হলো এই ধরণের মামলায় অগ্রসর হলে প্রানহানির ঝুঁকির সাথে সাথে ধর্ষিতাদের সামাজিক এবং ব্যক্তিগত ক্ষতিও জড়িত থাকে। অবিবাহিতা নারী হলে তার বিবাহ অনিশ্চিত হয়, বিবাহতা হলে তার বিবাহিত জীবন এবং তার সন্তানদের সামাজিক জীবন অনিশ্চিত হয়। ধর্ষণের শিকার জীবিত থাকেন আবার মৃত্যুবরনও করতে পারেন। তখন ধর্ষণ অপরাধের সাথে খুনের অপরাধও যুক্ত হয়। তাই মামলাকৃত ধর্ষণের সংখ্যা থেকে কি সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে যে দেশে ধর্ষণ আসলে তত নয়,যতটা বলা হয়?
আর্থিক অসঙ্গতি, চক্ষু-লজ্জা, সমাজের অগ্রহনযোগ্যতা, আইনের প্রতি অনাস্থা, ক্ষমতার অভাব ইত্যাদি কারণে অধিকাংশ ধর্ষণ অপ্রকাশিত থাকে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে প্রমানিত অধিকাংশ ধর্ষিতা নারীরা পর্যন্ত সমাজের কাছে নিগৃহীত হয়েছেন। আজ অবদি তাদের মানবেতর জীবন কাহিনী আমরা শুনতে পাই। ধর্ষণের ফলে জন্ম নেয়া সন্তানদের জীবন কতটা অস্বাভাবিক হয়েছে সেটি আরেকটি প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়। এই রকম একটি সামাজিক কাঠামো যেখানে যুদ্ধে ধর্ষিত নারী, শিশুদের পর্যন্ত বিচার হয় না, সামাজিক সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত হয়, সেখানে নিত্যদিনের ধর্ষিতারা কি সহানুভূতি পেতে পারে?
ধর্ষণ-মূল্যবোধ প্রতিকারের জন্য কী কী ভাবতে করতে পারি? একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং পারিবারিক শিক্ষা। পারিবারিক ক্ষেত্রে পুত্র সন্তান এবং কন্যা সন্তান উভয়কেই ধর্ষণ-বিরোধী মানসিকতা তৈরীর জন্য বিশেষভাবে শিক্ষা দিতে হবে এবং সচেতন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় অভিভাবক তাদের মেয়ে সন্তানের দিকে শুধু মনোযোগী থাকেন যেন সে কোথাও ধর্ষিত না হয়। তার মানে এই নয় যে মেয়ে সন্তানকে শারীরিক প্রতিরক্ষার কোন শিক্ষা দেয়া হয়। তাকে দুর্বল হিসাবে রেখেই তার ওপর দায়িত্ব বর্তান যেন সে নিজেকে ধর্ষণ থেকে নিজেকে রক্ষা করে চলে। নতুবা তার জীবন কলংকিত হবে এবং সুপাত্রে বিবাহের জন্য অযোগ্য হয়ে পড়বে।

একজন ভালো মেয়ের সংজ্ঞা দাঁড়ায় সে কতটা নিজেকে ঢেকে রাখছে, কতটা স্বাধীন চলাফেরা ত্যাগ করতে পারছে। অল্প বয়সে মেয়ে সন্তানকে বিয়ে দেয়ার পিছনে এই মানসিক ধারণা একটি অন্যতম প্রেরণা হিসাবে কাজ করে। ধর্ষিতা হওয়ার আগে বিয়ে দিয়ে দিতে পারলে যেন তাদের দায়িত্ব পালন শেষ হয়ে যায়। অভিভাবক ভাবেন না তাদের ছেলে সন্তানটি অন্য কারোর মেয়ে সন্তানের ধর্ষণের জন্য দায়ী হতে পারে। কিংবা হলেও সেটাকে তারা চারিত্রিক এবং সামাজিক হুমকি হিসাবে মনে করেন না। মেয়ে কেন একা একা বাইরে যায়, কেন পর্দা করে না, কেন বাইরে কাজ করে ইত্যাদি ইত্যাদি। একজন ছেলে সন্তান যদি পারিবারিকভাবে ধর্ষণবিরোধী মূল্যবোধ নিয়ে বড় হয়, তাহলে সে অবশ্যই ধর্ষণকে একটি বড় অপরাধ হিসাবেই গণ্য করবে। আবার অভিভাবকদের এই সম্ভাবনা গুরুত্বের সাথে নিতে হবে যে তাদের পুত্র সন্তানেরও ধর্ষিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সে ব্যাপারেও পারিবারিকভাবে শিক্ষা থাকতে হবে। প্রেমের আবরণে অনেক নির্বোধ কিশোরী, তরুণী এমনকি বয়স্কা নারীরাও প্রতারিত হয়। তার পরিণতি হয় ধর্ষণ এবং অনেকসময় এই রেকর্ডকৃত ধর্ষণ নিয়ে ব্ল্যাকমেইলিং সহ নানা রকমের ব্যবসায়ের ক্ষেত্র তৈরী হয়। এই প্রলোভনের শিকার হওয়ার কারণ হলো তাদের এবং অভিভাবকদের অজ্ঞতা এবং অভিভাবকদের সাথে তাদের দুরত্বপূর্ণ সম্পর্ক। প্রেম এবং প্রলোভনের পার্থক্য নির্ণয়ের শিক্ষা এবং সহযোগিতা পারিবারিক পরিবেশেই গড়ে উঠা প্রয়োজন।
এটা একটা স্বাভাবিক প্রত্যাশা যে আইনের মাধ্যমে নির্যাতন ঘটে যাওয়ার পর ধর্ষকের উপযুক্ত শাস্তি হলে তাতে অন্যরা ধর্ষণ অপরাধ থেকে বিরত থাকবে। আইন তো সেই প্রত্যাশা পুরণ করতে পারছে না। ধর্ষণ প্রতিরোধে আইনকে সফল হতে হলে-
১। নির্যাতিত ব্যক্তিদের জন্য আইনকে আশ্রয় হিসাবে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হবে। তাহলে এই ধরণের ঘটনায় আক্রান্ত সবাই আইনের কাছে যাবেই সে ব্যাপারে ধর্ষক নিশ্চিত থাকবে।
২। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে আইনের প্রয়োজনীয় প্রমান হিসাবে সাক্ষী এবং আলামতের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে গণশিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রমানকে অজুহাত করে অনেক মামলায় ধর্ষিতারা সুবিচার পায় না। সুবিচার না পাওয়ার ঘটনা পরবর্তীতে নতুন ধর্ষনের ঘটনাকে উৎসাহিত করে। কিছুদিন আগে খবরে প্রকাশিত একজন পিতা তার মেয়ে সন্তানকে নিয়ে ট্রেনে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছেন। মায়ের মন্তব্য ছিল,‘ তারা আল্লাহর কাছে গেছে বিচারের আশায়’। আইনের প্রতি কি গভীর অনাস্থার প্রতিফলন ঘটেছে এই মন্তব্যটিতে। মাস্তানদের শক্তি ও প্রতিপত্তির বিরুদ্ধে আইনের সাহায্যের বিশ্বাস থাকলে পিতা কন্যাকে সাথে করে আত্মহত্যাকে সমাধান হিসাবে বেছে নিতেন না।
৩। আইনের সিদ্ধান্তে কোন ক্ষমতার প্রভাব প্রতিফলিত হবে না।
যে কোন সামাজিক মূল্যবোধ গঠণে শিক্ষাব্যবস্থা সবচাইতে ফলপ্রসু ভূমিকা পালন করতে পারে। শিক্ষার দুইটি উদ্দেশ্য হলো আর্থিক অবলম্বন তৈরীতে মানুষের সক্ষমতা অর্জন, এবং সমাজের প্রয়োজনীয় মানবিক গুনাবলীসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব গঠণ। দুইটি উদ্দেশ্যই সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক শিক্ষাহীন শিক্ষাব্যবস্থায় কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্থ হয়। একজন নীতিহীন মানুষ তার কর্মক্ষেত্রেও নীতিহীন কাজ করবে। কর্মক্ষেত্রেও ধর্ষণের সংস্কৃতি আনতে দ্বিধাবোধ করবে না।

আজ বিশ্বে একদিকে যেমন শিক্ষার মহা প্রসার হচ্ছে আরেকদিকে তেমন ধর্ষণসহ সামাজিক অপরাধও বেড়ে যাচ্ছে। কারণ শিক্ষা কার্যক্রমে সামাজিক উদ্দেশ্যটি খুবই উপেক্ষিত। তাই তো স্বয়ং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শ্লীলতাহানির খবর পাওয়া যায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্ষণকে একটি সামাজিক অপরাধ হিসাবে শিক্ষণীয় বিষয় করা উচিৎ। এই শিক্ষাপাঠের উদ্দেশ্য হবে একদিকে ধর্ষণ বিরোধী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং তার সাথে ধর্ষণের আইনগত অধিকারে সচেতন করা ও যে কোন ধর্ষণে প্রতিবাদী হতে উদবুদ্ধ করা। জীবনের একটি অপরিহার্য বিষয় হলো সেক্স।

অথচ এই সেক্স আমাদের সমাজে বর্তমানকাল পর্যন্ত একটি লুকানোর বিষয়, একটি লজ্জার বিষয়। বয়ঃসন্ধিকাল থেকে তাই সেক্স সম্পর্কে ধারণা নেয়ার জন্য সবাই নির্ভরশীল হয় ব্যবসায়িক ছাপা এবং অনলাইন সেক্স উৎসগুলির ওপর। সেখান থেকে তারা সেক্সের প্রতি আগ্রহের শিক্ষা পায়, সেক্সের বিষয়ে কোন শিক্ষা পায় না। মানবিক জীবনে সেক্সেরও যে একটি মানবিক ব্যবহার রয়েছে সেই শিক্ষা কারোর গ্রহন করা হয় না।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাই সেক্স এর ওপর কোর্স থাকা প্রয়োজন। এই কোর্সের উদ্দেশ্য হবে সেক্সকে জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসাবে ধারণ তার যথাযথ ব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করা। এই কোর্সের উদ্দেশ্য হবে সেক্স সম্পর্কে সকলের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন আনয়ণ। ধর্ষণ যে সেক্সের একটি বিকৃত প্রকাশ এবং একটি ঘৃন্য সামাজিক অপরাধ সে ব্যাপারে শিক্ষা হবে এই কোর্সের একটি প্রধান ফলাফল। বিভিন্ন জাতির ভিন্ন সংস্কৃতিতে সেক্স এর ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরা হবে। তাছাড়া ধর্ষণ পরবর্তী সম্ভাব্য সমস্যাগুলির ব্যাপারে অজ্ঞতাও হয়তো কিছু কিছু ধর্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে। সেক্স কোর্স পাঠের মাধ্যমে অনেকের সেই অজ্ঞতাও পূরণ সম্ভব হবে।

ধর্ষণ ক্ষমার অযোগ্য একটি অপরাধ। ধর্ষণ একটি শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন। ধর্ষণ অপরাধ একটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। একটি ব্যর্থতা পরিবারের, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের, এবং আইনব্যবস্থার। পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রয়াসে সেই সামাজিক মূল্যবোধ তৈরি হতে হবে যেখানে ধর্ষণের পক্ষে কোন যুক্তি খুঁজে বেড়ানো হবে না, এবং সতীত্বের সংজ্ঞায় ধর্ষককেই সতীত্ব হারাতে হবে। আইনের শাসন এমন হতে হবে যেখানে ধর্ষকের কোন আশ্রয় মেলে না। রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে যেন পরিবার, শিক্ষা, এবং আইন ধর্ষণ-বিরোধী ভূমিকায় কোন অবহেলা না করে।
লেখক : সাবেক শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যায়

 

fatemaorama@gmail.com

* প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। লাস্টনিউজবিডি‌’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে
মিল নেই। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য লাস্টনিউজবিডি‌ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

 

Print Friendly, PDF & Email

Comments are closed

পেপার কর্ণার
Lastnewsbd.com
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন >

আপনি কি মনে করেন বাসে আগুন দিয়ে কি সরকার পরিবর্তন করা যাবে ?

View Results

Loading ... Loading ...
আর্কাইভ
মতামত
যুবলীগের নতুন নেতৃত্বঃ পরশের পরশ ছোঁয়ায় জেগে উঠুক কোটি তরুণ
।।মানিক লাল ঘোষ।।"আমার চেষ্টা থাকবে যুব সমাজ যেনো...
বিস্তারিত
সাক্ষাৎকার
সফল হওয়ার গল্প, সাফল্যের পথ
।।আলীমুজ্জামান হারুন।। ১৯৮১ সালে যখন নিটল মটরসের য...
বিস্তারিত
জেলার খবর
Rangpur

    রংপুরের খবর

  • রেলের উচ্ছেদ হওয়া ১৫০ পরিবারের পূণর্বাসন বন্দোবস্ত
  • বিরল প্রজাতির শুকুন পাখি উদ্ধার
  • চিকিৎসা সামগ্রী চুরি, হাতেনাতে ধরা খেলেন হাসপাতালের কর্মচারী

আপনি কি মনে করেন বাসে আগুন দিয়ে কি সরকার পরিবর্তন করা যাবে ?

  • না (63%, ১৫ Votes)
  • হ্যা (29%, ৭ Votes)
  • মতামত নাই (8%, ২ Votes)

Total Voters: ২৪

Start Date: নভেম্বর ১৩, ২০২০ @ ২:৫৪ অপরাহ্ন
End Date: No Expiry

How Is My Site?

  • Good (0%, ০ Votes)
  • Excellent (0%, ০ Votes)
  • Bad (0%, ০ Votes)
  • Can Be Improved (0%, ০ Votes)
  • No Comments (100%, ০ Votes)

Total Voters:

Start Date: নভেম্বর ১৩, ২০২০ @ ২:৫৪ অপরাহ্ন
End Date: No Expiry