ইতিহাসের অবিসংবাদিত সত্য 'বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষক'
Wednesday, 7th June , 2017, 07:58 pm,BDST
Print Friendly, PDF & Email

ইতিহাসের অবিসংবাদিত সত্য ‘বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষক’



।।মো: নুর নবী।।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা বিষয়টি সুস্পষ্ট হওয়া সত্তেও স্বাধীনতা পরবর্তীতে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ করার অপপ্রয়াস চালানো হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নস্যাৎ করার জন্য মেতে ওঠে একদল স্বার্থান্বেষী মহল। এর দ্বারা বাঙালি জাতির ইতিহাসকে বিকৃত করার যে ষড়যন্ত্র চালানো হয় তা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জার। এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। বঙ্গবন্ধুর স্বাধিনতা ঘোষণার কিছু ঐতিহাসিক সত্য আমাদের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু।

এক. জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ই মার্চ পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ এবং ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা একই সূত্রে গাঁথা। জাতীয় অধ্যাপক কবির চৌধুরী বলেছেন, ”এই ভাষনেই স্বাধীনতা ঘোষিত হয়ে গেছে, তবে বঙ্গবন্ধু শব্দচয়নের কৌশল হিসেবে বলেছেন, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। যদি বলতেন, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন, সেটা হতো হঠকারিতা, তাতে মহা বিপর্যয় ঘটতো।” ভাষাগত চাতুর্যের কারণে পাকিস্তান সরকার তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে অনুধাবন করা যায় যে, তিনি পরোক্ষভাবে ঐদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য যুদ্ধ প্রস্তুতির ঘোষণা দিয়েছেন। বস্তুত ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা ৭ মার্চের বক্তৃতাকে আনুষ্ঠানিকতা প্রদান করে।

দুই. বঙ্গবন্ধু গ্রেফাতর হওয়ার পূর্বে অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং তা প্রচারের জন্য নির্দেশ প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয় রাত ১.৩০টার সময়। এর পূর্বেই অর্থাৎ ২৫ মার্চ রাত ১২টা ২০ মিনিটে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা বাণীটি পরবর্তীতে ওয়্যারলেসযোগে চট্টগ্রামে প্রেরিত হয়। পরের দিন বিবিসি-ও প্রভাতি অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি প্রচারিত হয়। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা শোনামাত্রই সর্বত্র প্রতিরোধ শুরু হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণা ২৭ মার্চ ব্রিটিশ পত্রপত্রিকায় ফলাও করে প্রকাশিত হয়। বস্তুত গণমাধ্যমে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারের মধ্য দিয়ে গোটা বিশ্বের দৃষ্টি পড়ে বাংলাদেশের প্রতি। ২৭ মার্চ The Times পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ব্যানার হেডিং “Heavy fighting as Sheikh Mujibur Declares E. Pakistan Independent” (‘শেখ মুজিবুর পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন, সেখানে প্রচ- যুদ্ধ চলছে’)। একই তারিখে ব্রিটিশ অন্যান্য গণমাধ্যমে সংবাদটি ব্যাপকভাবে প্রচার হয়। The Guardian পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় “Heavy fighting after UDI [Unilateral Declaration of Independence] by East Pakistan” শিরোনামে সংবাদটি প্রচারিত হয়। এতে বলা হয়, ২৬ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জাতির উদ্দেশ্যে বেতারভাষণের পরপরই ‘The Voice of Bangladesh’ নামে একটি গোপন বেতার কেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে এবং তাঁর এই ঘোষণা অপর এক ব্যক্তি পাঠ করেন | Financial Times পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ‘Civil war after East Pakistan declares independence’ এ শিরোনামে লিখে : ‘গতকাল (২৬ মার্চ) শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হিসেবে ঘোষণা দিলে সেখানে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে’। The Daily Telegraph পত্রিকার প্রথম প্রষ্ঠায় নতুন দিল্লি থেকে পত্রিকার প্রতিনিধি ডেভিড লোশাক কর্তৃক পাঠানো সংবাদের ভিত্তিতে “CIVAIL WAR FLARES IN E. PAKISTAN : Sheikh ‘a traitor’, says President” এ শিরোনামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার কথা উল্লেখ করা হয়। ২৮ মাচ © The (Sunday) Observer পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় “Sheikh calls on UN for help” এ শিরোনামে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার সংবাদ তুলে ধরে উল্লেখ করা হয় যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র, বিশেষ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ও জাতিসংঘের প্রতি তাঁর জনগণের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাহায্য-সহযোগিতা প্রদানের আহ্বান জানান।

কেবল দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমই নয়, বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণা বাণীটি সংযোজিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ দলিলেও। হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র শীর্ষক গ্রন্থে (৩য় খণ্ডেরর ১ম পৃষ্ঠায়) বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা বণীটি সন্নিবেশিত রয়েছে। মূল ঘোষণাটি নিম্নরূপ: This may be my last message, from to-day Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldiers of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved. [অর্থাৎ এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে তা নিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত দেশবাসীকে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।]

চট্টগ্রমের কতিপয় আওয়ামী লীগ নেতা কালুরঘাটে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’ স্থাপন করেন। কারো কারো মতে, এই কেন্দ্র থেকে ২৬ মার্চ বেলা ২.১০টায় চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল হান্নান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি প্রচার করেন এবং একই কেন্দ্র থেকে ২৭ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান প্রথমে নিজ নামে এবং পরে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। ২৬ মার্চ মো. আবদুল হান্নানের ঘোষণাটি নিম্নরূপ: “আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশ ও তাঁর নামে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। আপনারা যারা এ গোপন রেডিও হতে আমার এই ঘোষণা শুনছেন তারা অন্যদের নিকট এই বাণী প্রচার করবেন। আর যার নিকট যা কিছু আছে তা নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করুন এবং দেশকে মুক্ত করুন।”

২৭ মার্চ মেজর জিয়উর রহমান কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার যে ঘোষণাটি প্রচার করেন, তা ভারতের ‘দি স্টেট্সম্যান’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র শীর্ষক গ্রন্থে (৩য় খণ্ডের ২য় পৃষ্ঠায়) ঘোষণাটি লিপিবদ্ধ রয়েছে। মূল ইংরেজি ঘোষণাটির বাংলা নিম্নরূপ:“আমি মেজর জিয়া, বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর অস্থায়ী সেনাপতি, শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।আমি ঘোষণা করছি, আমরা শেখ মুজিবুর রহমানের অধীনে সর্বভৌম বৈধ সরকার গঠন করছি। আমরা অঙ্গীকার করছি যে, এই সরকার আইন ও সংবিধান মতে দেশ চালাবে। এই নতুন গণপ্রজাতন্ত্রী সরকার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জোট নিরপেক্ষ থাকবে। বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের সাথে এই সরকার বন্ধুত্ব কাসনা করে এবং বিশ্বশান্তির জন্য কাজ করে যাবে। আমি সকল সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি তারা যেন বাংলাদেশের বর্বর গণহত্যার বিরুদ্ধে তাদের জনমত গড়ে তোলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের অধীনে বাংলাদেশ সরকার সার্বভৌম ও বৈধ। এই সরকার বিশ্বের গণতন্ত্রী জাতির স্বীকৃতি প্রত্যাশা করে।”

১৯৭১ সালের মার্চে প্রচারিত বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা মুাক্তযুদ্ধের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ দলিল। পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আবদুল হান্নান, মেজর জিয়া ও স্থানীয় পর্যায়ের কিছু ঘোষণার মূল ভিত্তি ছিল বঙ্গবন্ধুর ২৬ মার্চের ঘোষণাপত্র। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার দিবসটিই পরবর্তীতে সংবিধানে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। সুতরাং ইতিহাসের চিরন্তন সত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করা মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অস্বীকারের শামিল।

মো: নুর নবী: গবেষক, গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র; এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Print Friendly, PDF & Email

Comments are closed

পেপার কর্ণার
Lastnewsbd.com
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন >

জার্মানির বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, নাক দিয়েও মস্তিস্কে করোনা হানা দেয়। আপনি কি মনে করেন মস্তিস্কে করোনার আক্রমণ রক্ষার্থে মাস্ক ই যথেষ্ট?

View Results

Loading ... Loading ...
আর্কাইভ
মতামত
যুবলীগের নতুন নেতৃত্বঃ পরশের পরশ ছোঁয়ায় জেগে উঠুক কোটি তরুণ
।।মানিক লাল ঘোষ।।"আমার চেষ্টা থাকবে যুব সমাজ যেনো...
বিস্তারিত
সাক্ষাৎকার
সফল হওয়ার গল্প, সাফল্যের পথ
।।আলীমুজ্জামান হারুন।। ১৯৮১ সালে যখন নিটল মটরসের য...
বিস্তারিত
জেলার খবর
Rangpur

    রংপুরের খবর

  • বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য উচ্ছেদের হুমকি প্রদানকারীদের বিচারের দাবি
  • দিবালোকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জমি দখলের অভিযোগ
  • রেলের উচ্ছেদ হওয়া ১৫০ পরিবারের পূণর্বাসন বন্দোবস্ত

জার্মানির বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, নাক দিয়েও মস্তিস্কে করোনা হানা দেয়। আপনি কি মনে করেন মস্তিস্কে করোনার আক্রমণ রক্ষার্থে মাস্ক ই যথেষ্ট?

  • হ্যা (0%, ০ Votes)
  • না (0%, ০ Votes)
  • মতামত নাই (100%, ০ Votes)

Total Voters:

Start Date: ডিসেম্বর ২, ২০২০ @ ৩:১৯ অপরাহ্ন
End Date: No Expiry

মডার্নার, ফাইজারের করোনা ভাইরাসের টিকার মধ্যে মডার্নার টিকার উপর কি আপনার আস্থা বেশি ?

  • মতামত নাই (100%, ১ Votes)
  • হ্যা (0%, ০ Votes)
  • না (0%, ০ Votes)

Total Voters:

Start Date: ডিসেম্বর ২, ২০২০ @ ৯:১৯ পূর্বাহ্ন
End Date: No Expiry

মার্কিন টিকা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মডার্নার দাবি করেছেন অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ রোগীর ওপর এ টিকা ১০০ শতাংশ কাজ করেছে। আপনি কি শতভাগ ফলপ্রসু মনে করেন?

  • হ্যা (100%, ১ Votes)
  • না (0%, ০ Votes)
  • মতামত নাই (0%, ০ Votes)

Total Voters:

Start Date: ডিসেম্বর ১, ২০২০ @ ১২:৫১ অপরাহ্ন
End Date: No Expiry

ফাইজার, অক্সফোর্ড, রাশিয়ান, চায়নার ভ্যাকসিনগুলোকে আপনি কি করোনা প্রতিরোধক কার্যকর টিকা বলে মনে করেন?

  • না (67%, ২ Votes)
  • মতামত নাই (33%, ১ Votes)
  • হ্যা (0%, ০ Votes)

Total Voters:

Start Date: নভেম্বর ২৯, ২০২০ @ ৫:২৮ অপরাহ্ন
End Date: No Expiry

ফাইজার, অক্সফোর্ড, রাশিয়ান ইন, চায়না ভ্যাকসিনগুলোকে আপনি কি করোনা প্রতিরোধক কার্যকর টিকা বলে মনে করেন?

  • হ্যা (0%, ০ Votes)
  • না (0%, ০ Votes)
  • মতামত নাই (100%, ০ Votes)

Total Voters:

Start Date: নভেম্বর ২৯, ২০২০ @ ৪:৫৭ অপরাহ্ন
End Date: No Expiry

 Page ১ of ২  ১  ২  »