ভারত থেকে ব্রিটেনে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা!
প্রকাশিত: ৭:৫১:০০ অপরাহ্ণ, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংগৃহীত ছবি
লাস্টনিউজবিডি, ১৫ এপ্রিল: সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে আবারও নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে- তিনি কি ভারত ছেড়ে ব্রিটেনে চলে যাচ্ছেন? গত কয়েক মাসে বাংলাদেশি, ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে এ ধরনের আলোচনা সামনে এলেও, এখন পর্যন্ত তাঁর ব্রিটেন যাত্রা বা সেখানে স্থায়ীভাবে যাওয়ার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিত ঘোষণা পাওয়া যায়নি। বরং প্রাপ্ত তথ্য বলছে, বিষয়টি এখনও জল্পনা, কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ ও আইনি জটিলতার মধ্যেই আটকে আছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছাড়ার পর শেখ হাসিনা ভারত যান। এরপর থেকেই তাঁর অবস্থান, ভবিষ্যৎ গন্তব্য এবং রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে নানা গুঞ্জন ছড়ায়। একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি দিল্লির একটি সুরক্ষিত সরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকা বাসভবনে অবস্থান করছেন। বিশেষ করে ভারতীয় নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে তাঁকে রাখা হয়েছে বলে বাংলাদেশ ও ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।
লাস্টনিউজবিডি, ১৫ এপ্রিল: দিল্লি আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর অবস্থান বা অবস্থানের শর্তাবলি নিয়ে বিস্তারিত কিছু না বললেও, বিষয়টি যে সংবেদনশীল কূটনৈতিক বিবেচনার মধ্যে রয়েছে, তা স্পষ্ট।
শেখ হাসিনার ব্রিটেনে যাওয়ার গুঞ্জন নতুন নয়। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকেই ভারতীয় ও বাংলাদেশি কিছু সংবাদমাধ্যমে খবর আসে, তিনি হয়তো যুক্তরাজ্যে যেতে পারেন। কিছু প্রতিবেদনে এমনও বলা হয়, ভারত তাঁকে অন্তর্বর্তীকালীন অবস্থান দিয়েছে এবং পরবর্তী গন্তব্য হতে পারে ব্রিটেন। কিন্তু এই সম্ভাবনার সঙ্গে সঙ্গেই সামনে আসে বড় প্রশ্ন- তিনি কি সত্যিই ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় বা অন্য কোনো আইনি ব্যবস্থায় যেতে পারবেন?
এই প্রশ্নের উত্তর সরল নয়। কারণ, ব্রিটেনের আশ্রয়নীতি, ভিসা আইন, নিরাপত্তা মূল্যায়ন, কূটনৈতিক বার্তা এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া- সব মিলিয়ে এটি একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়।
২০২৪ সালের আগস্টে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের বক্তব্য উদ্ধৃত করে কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যের প্রচলিত অভিবাসন আইনে কেউ স্রেফ ‘আশ্রয় চাইতে’ সরাসরি দেশটিতে উড়ে যেতে পারেন না, বিশেষ করে তিনি যদি আগে থেকেই অন্য একটি দেশে অবস্থান করেন। একই সময় শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছিলেন, তাঁর মা আনুষ্ঠানিকভাবে আশ্রয় চাননি- এমন দাবি সংবাদমাধ্যমে আসে।
এর মানে, শেখ হাসিনার ব্রিটেনে যাওয়ার প্রশ্নটি শুধু তিনি যেতে চান কি না, এই পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ব্রিটেন তাঁকে কী স্ট্যাটাসে গ্রহণ করবে, সেটিই মূল প্রশ্ন। সম্ভাব্য পথ হতে পারে ভিজিট বা বিশেষ প্রবেশ অনুমতি, মানবিক বা কূটনৈতিক বিবেচনায় বিশেষ ব্যবস্থা, পারিবারিক যোগাযোগভিত্তিক প্রবেশের সুযোগ, অথবা আশ্রয়-সংশ্লিষ্ট কোনো আইনি পথ। কিন্তু এসবের কোনোটিই এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে নিশ্চিত হয়নি।
ব্রিটেনকে ঘিরে আলোচনার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, শেখ হাসিনার পরিবারের সঙ্গে ব্রিটেনের দীর্ঘ ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সংযোগ আছে। তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। পরিবারটির একটি অংশের সঙ্গে লন্ডনের যোগাযোগ পুরোনো। ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ব্রিটেনকে সম্ভাব্য নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে দেখা হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
দ্বিতীয়ত, ব্রিটেনে বাংলাদেশি প্রবাসী সমাজ, বিশেষ করে লন্ডনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক, ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী। শেখ হাসিনা সেখানে গেলে তা কেবল ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বা চিকিৎসা-সুবিধার বিষয় হবে না; বরং রাজনৈতিক পুনর্গঠন, প্রবাসী সমর্থন পুনর্বিন্যাস এবং আন্তর্জাতিক প্রচারণার ক্ষেত্র হিসেবেও তা বিবেচিত হতে পারে।
তৃতীয়ত, শেখ হাসিনার ব্রিটেনে যাওয়া মানেই বিষয়টি ভারত-ব্রিটেন-বাংলাদেশ ত্রিমুখী কূটনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠবে। ভারত এ বিষয়ে শুরু থেকেই অত্যন্ত সতর্ক ও নীরব অবস্থান নিয়েছে। দিল্লি শেখ হাসিনাকে কী স্ট্যাটাসে রেখেছে, কতদিনের জন্য রেখেছে, কিংবা তাঁর ভবিষ্যৎ গন্তব্য নিয়ে কোনো রাষ্ট্রীয় আলোচনায় আছে কি না- এসব বিষয়ে ভারত সরকার প্রকাশ্যে খুব সীমিত মন্তব্য করেছে। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ভারত বিষয়টিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির ফ্রেমে দেখছে।
ভারতের জন্য বিষয়টি সহজ নয়। কারণ, শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন ভারতের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁকে নিয়ে প্রকাশ্য অবস্থান নিলে দিল্লির জন্য কূটনৈতিক চাপ বাড়তে পারে। আবার তাঁকে অনির্দিষ্টকাল ভারতে রাখা হলেও সেটি নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। এই বাস্তবতায়, যদি কখনও শেখ হাসিনা ব্রিটেন যান, তাহলে তা সম্ভবত দীর্ঘ আলোচনার পর, নীরব কূটনৈতিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে হবে- হঠাৎ নাটকীয়ভাবে নয়।
বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও এমন কোনো পদক্ষেপের তাৎপর্য কম নয়। শেখ হাসিনা যদি ভারত ছেড়ে ব্রিটেনে যান, তাহলে তাঁর বর্তমান অবস্থানকে অস্থায়ী নিরাপদ আশ্রয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক নির্বাসনের শুরু হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হতে পারে। দলটির ভেতরে কিংবা প্রবাসী সমর্থক গোষ্ঠীর মধ্যে নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা প্রশ্নে নতুন করে হিসাব-নিকাশ দেখা দিতে পারে।
লন্ডন আন্তর্জাতিক মিডিয়া, মানবাধিকার সংস্থা, আইনজীবী নেটওয়ার্ক এবং প্রবাসী রাজনৈতিক তৎপরতার একটি বড় কেন্দ্র। ফলে ব্রিটেনে গেলে শেখ হাসিনা বা তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বলয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার জন্য তুলনামূলক বেশি সক্রিয় হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, মানবাধিকার প্রশ্ন, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক মতামত গঠনের ক্ষেত্রে লন্ডন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এই মুহূর্তে শেখ হাসিনা ভারত থেকে ব্রিটেনে ‘চলে যাচ্ছেন’ এমন কোনো আনুষ্ঠানিক, যাচাইকৃত এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি। বরং এখন পর্যন্ত যা পাওয়া যাচ্ছে, তা হলো তিনি এখনও ভারতেই অবস্থান করছেন বলে একাধিক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত আছে; ব্রিটেনে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা পুরোনো এবং তা মাঝেমধ্যে নতুন করে সামনে আসছে; কিন্তু তাঁর যাত্রা, ভিসা, আশ্রয়, বা ব্রিটিশ সরকারের সম্মতি- কোনোটিই নিশ্চিতভাবে প্রকাশিত হয়নি। খবর-ঠিকানা
লাস্টনিউজবিডি/কেএম