পুরুষদের যৌনক্ষমতা কমে যায় যে কারণে, জানুন সমাধানও
প্রকাশিত: ৬:৪৫:০০ অপরাহ্ণ, ৮ নভেম্বর, ২০২৪

যৌন অক্ষমতা
লাস্টনিউজবিডি, ৮ নভেম্বর: যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়া বা এ ধরনের কোনো কাজে উৎসাহ না পাওয়ার মতো উপসর্গ অনেকের মধ্যে থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর কারণ কী তা জানেন না অনেকেই।
স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন সংস্থা এবং চিকিৎসকরা বলছেন, এ ধরনের উপসর্গের পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে টেস্টোস্টেরন নামে এক ধরনের লিঙ্গ নির্ধারণী হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়া। একে বলা হয় টেস্টোস্টেরন ঘাটতি।
বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত এই হরমোন খুব বেশি মাত্রায় না বাড়লেও ছেলেদের মধ্যে এটির মাত্রা বেশি থাকে। বয়ঃসন্ধিকালের পর এই হরমোনের মাত্রাটা হঠাৎ করে বেড়ে যায় এবং সে একজন পরিপূর্ণ পুরুষ হওয়ার জন্য তৈরি হয়। দাঁড়ি-গোঁফ তৈরি হওয়া থেকে শুরু করে যৌনাঙ্গের পরিপক্বতা, জননাঙ্গের পরিপূর্ণ আকার, ঘাম, মানসিকভাবে পুরুষালি আচরণ- টোটালটাই এই হরমোন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
টেস্টোস্টেরন কী?
টেস্টোস্টেরন হচ্ছে এক ধরনের হরমোন যা পুরুষের মধ্যে পুরুষালি বৈশিষ্ট্যের বিকাশ ঘটায়। এ কারণে একে অ্যান্ড্রোজেন বা সেক্স হরমোন বা লিঙ্গ নির্ধারণী হরমোনও বলা হয়। এই হরমোন অণ্ডকোষে তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের টুইন্সবার্গ ফ্যামিলি হেলথ এন্ড সার্জারি সেন্টারের এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট কেভিন এম প্যান্টালোন বলেন, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার মধ্যেই টেস্টোস্টেরন হরমোন থাকে। তবে পুরুষের মধ্যে এই হরমোনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেশি থাকে। যার কারণে পুরুষের প্রজনন কার্যক্রম বিকাশ লাভ করে ও যৌনাঙ্গ গঠিত হয়।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অধীনে হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, টেস্টোস্টেরনের এর ফলে হাড় এবং মাংস পেশীর গঠন প্রভাবিত হয়। ছেলেদের হাড় ও মাংসপেশীর ঘনত্ব বাড়ে, রক্তে লোহিত কণিকার উৎপাদন বাড়ে, কণ্ঠস্বরে পরিবর্তন হয়ে তা ভারী হয়, মুখে দাড়ি হয়, শরীরের অন্যান্য অংশ লোম বাড়ে, যৌনাঙ্গের বৃদ্ধি ঘটে। একই সাথে যৌন ক্রিয়া এবং প্রজনন সক্ষমতা জাগ্রত হয়।
টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি কী?
এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট কেভিন এম প্যান্টালোন বলেন, টেস্টোস্টেরনের ঘাটতিকে মেল হাইপোগোনাডিজম বা লো-টি(Low-T) ও বলা হয়। এটা এমন একটা অবস্থা যখন অণ্ডকোষ পর্যাপ্ত টেস্টোস্টেরন উৎপাদন করতে পারে না।
তিনি বলেন, বয়সের সাথে সাথে এই হরমোন কমে যাওয়াটা স্বাভাবিক। ত্রিশ বছর বয়সের পর সাধারণত প্রতিবছর এক শতাংশ হারে এটি কমতে থাকে। তবে যখন এই কমতির হার বয়স ছাড়াও অন্যান্য নানা বিষয় দ্বারা প্রভাবিত হয়, তখনই এটিকে ঘাটতি হিসেবে ধরা হয়।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অধীনে হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাভাবিক পুরুষদের মধ্যে বিভিন্ন মাত্রায় টেস্টোস্টেরন থাকার কথা জানা যায়। প্রতি ডেসিলিটারে ২৭০ থেকে শুরু করে ১০৭০ ন্যানোগ্রাম পর্যন্ত টেস্টোস্টেরন থাকতে পারে। প্রতি ২৪ ঘণ্টায় টেস্টোস্টেরেনের মাত্রা উঠানামা করে। সকাল আটটায় এই হরমোনের উৎপাদন সবচেয়ে বেশি থাকে। আর সবচেয়ে কম থাকে রাত ৯টায়।
আমেরিকান ইউরোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক পুরুষদের জন্য কমপক্ষে ৩০০ ন্যানোগ্রাম পার ডেসিলিটার থাকাটা স্বাভাবিক। এর চেয়ে কম যদি কারো টেস্টোস্টেরন থাকে তাহলে তার চিকিৎসা নেয়া উচিত।
লক্ষণ কী?
টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার প্রথম লক্ষণ হচ্ছে লিবিডোর মাত্রা কমে যাবে এবং এর কারণে যৌনাকাঙ্ক্ষা কমে যাবে। এটা ব্যক্তি নিজে বা তার সঙ্গী বুঝতে পারবে। পুরুষের পেশীর শক্তি কমে যাবে। ফলে যে আগের মতো কাজ করতে পারবে না। খাওয়ার পর কাজ করার আগ্রহ কমে যাওয়া।
অনেকের চামড়া ঝুলে যেতে পারে। তবে এটা টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি মারাত্মক হলে দেখা দেয়। কারণ পেশীর ঘনত্ব নির্ভর করে টেস্টোস্টেরনের কার্যক্রমের উপর। কমে গেলে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পুরুষদের বিকৃত যৌন আচরণের অন্যতম কারণ হচ্ছে টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি। এই হরমোনের ঘাটতির কারণে বন্ধ্যাত্বও দেখা দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অলাভজনক অ্যাকাডেমিক মেডিকেল সেন্টার ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, কম টেস্টোস্টেরনের যেসব উপসর্গ থাকে তার মধ্যে রয়েছে: যৌন তাড়না কমে যাওয়া, যৌনাঙ্গ উত্থানে অক্ষমতা, যৌন মিলনে অক্ষমতা, অণ্ডকোষ সঙ্কুচিত হওয়া, শুক্রাণুর উৎপাদন কমে যাওয়া। এছাড়াও ঘুমে সমস্যা, মনোযোগে সমস্যা, কাজে উৎসাহ না পাওয়া, মাংস পেশী ও শক্তি কমে যাওয়া, হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া, পুরুষদের স্তন গঠিত হওয়া, বিষণ্ণতা, ক্লান্তি ও অবসাদ।
টেস্টোস্টেরনের ঘাটতির কারণ কী?
৮৫-৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে অণ্ডকোষের কোন ধরনের ক্ষতি হলে টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি দেখা দেয়। বাংলাদেশে সবচেয়ে স্বাভাবিক কারণ হচ্ছে, বয়ঃসন্ধিকালে বা এর আশেপাশে সময়ে যদি কারো মামস হয়ে থাকে, তাহলে তার মামস অরক্রাইটিস হয়। এটি গলার পাশাপাশি অণ্ডকোষকেও আক্রান্ত করে। এর ফলে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি তৈরি হওয়ার পথ তৈরি হয়। কারণ টেস্টোস্টেরন উৎপাদিত হয় এখান থেকেই।
আরেকটি কারণ হচ্ছে স্থূলতা। দেহের অতিরিক্ত মেদ সরাসরি টেস্টোস্টেরনের ঘাটতিতে অবদান রাখে। এছাড়া যাদের বিভিন্ন ধরনের রেডিয়েশনে থাকতে হয় বা চিকিৎসাজনিত কারণে কেমোথেরাপি দিতে হয়, তাদের টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি দেখা দেয়।
আঘাতজনিত কারণ বা দুর্ঘটনার কারণে যদি কারো অণ্ডকোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, জীনগত সমস্যা থাকে, তাহলে এই হরমোনের ঘাটতি থাকতে পারে। কারো যদি জন্মগতভাবে অণ্ডকোষ না থাকে বা সেটি যদি পরিপূর্ণ গঠিত না থাকে, ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থাকে, যৌন সংক্রমণজনিত রোগ থাকে, কোনো ভাইরাসের সংক্রমণ থাকে, বা টিউমার থাকে তাহলেও টেস্টোস্টেরনের উৎপাদন কমে যেতে পারে।
এছাড়া মস্তিষ্কে আঘাত পেলে, লিভার সিরোসিস, কিডনির সংক্রমণ, অতিরিক্ত মদ্যপান, ঘুমে সমস্যা বা স্লিপ অ্যাপনিয়া এবং মানসিক রোগের চিকিৎসায় ওষুধ সেবন করলেও এই হরমোনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের এক গবেষণায় বলা হয়, পুরুষদের মধ্যে যারা স্থূলকায় তাদের ৩০ শতাংশের মধ্যে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কম থাকে। আর স্বাভাবিক ওজনের পুরুষদের মধ্যে এই হার মাত্র ৬ শতাংশ। আর টাইপ-২ ডায়াবেটিস রয়েছে এমন পুরুষদের মধ্যে টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি থাকে ২৫ শতাংশের মধ্যে। স্বাভাবিক পুরুষদের মধ্যে এই হার ১৩ শতাংশ।
কীভাবে প্রতিরোধ সম্ভব?
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, যদি জীনগত কারণে, অণ্ডকোষে ক্ষতির কারণে অথবা হাইপোথ্যালামাস বা পিটুইটারি গ্রন্থিতে আঘাতের কারণে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যায়, তাহলে তার কোনো চিকিৎসা করা সম্ভব নয়।
তবে কিছু জীবনযাত্রায় কিছু অভ্যাস পরিবর্তন বা সংযোজন করে টেসটোসটেরনের মাত্রা স্বাভাবিক রাখা যায়। এগুলো হচ্ছে- স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম করা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, অতিরিক্ত পরিমাণ অ্যালকোহল পান ও মাদক থেকে দূরে থাকা।
টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি ঠেকাতে হলে দৈহিক ওজন অবশ্যই কমাতে হবে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। মামস হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে, যাতে অণ্ডকোষ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
লাস্টনিউজবিডি/এএইচ