Loading...
Wednesday, 1st November , 2017, 10:10 pm,BDST
Print Friendly, PDF & Email

আমাদের উৎপলকে ফিরিয়ে দাও



।।পীর হাবিবুর রহমান ।।

মনটা একদম ভালো নেই। শীত আসি আসি করছে। শীতের অতিথি পাখিরা এখনো উড়ে আসেনি গান গাইতে গাইতে। বর্ষা আর শীত আমার খুব প্রিয়। বর্ষায় হাওর যৌবন ফিরে পায়, হেমন্তে মরা কঙ্কাল। মেঘালয়ে সিথান দিয়ে শুয়ে থাকা সীমান্ত শহর সুনামগঞ্জের মাটিতে জন্ম ও বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে এ সত্য উপলব্ধি করেছি। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা ষাটের ছাত্র রাজনীতিতে যার বক্তৃতায় পল্টনে ঢেউ খেলে যেত সেই নূরে আলম সিদ্দিকী একবার জানতে চেয়েছিলেন, আমার বিভিন্ন লেখা ও কলামে সুনামগঞ্জকে এত টেনে আনি কেন? উত্তরে বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলাম, প্রকৃতি অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুনামগঞ্জে বংশ পরম্পরায় আমার শেকড় রয়েছে। পূর্বপুরুষের ভিটেমাটিই নয়, অনেকে সেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন। যেখানে আমারও স্থায়ী ঠিকানা নির্ধারণ হবে। সেই মাটি ও মানুষের প্রতি আমার ভালোবাসার ঋণ রয়েছে। ঋণ রয়েছে আমার নাড়িপোতা শহরের কাছে। যে শহরের অসাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক সম্প্রীতি এবং সাংস্কৃতিক গণজাগরণের সূচনা ও ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছিলেন আমার পূর্বপুরুষরা। আমি কেবল সেই শহরকে আলোর ঝরনাধারায় উদ্ভাসিত করার চেষ্টা করেছি। একটি অবহেলিত জনপদ রাজনীতি, প্রাকৃতিক সম্পদ, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় কতটা উজ্জ্বল ও বর্ণময় হতে পারে, সেই সত্যকে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছি।

Loading...

আমার সেই জনপদ ও মানুষকে ভালোবাসা দেওয়া ছাড়া কিছু নেই বলে কলমের প্রতিটি শব্দে শব্দে হূদয়নিঃসৃত ভালোবাসায় তুলে আনি। তুলে আনি চেনা শহরের চেনা প্রকৃতি ও চেনা মানুষের গল্প। যে গল্প নিয়ে অহংকার করা যায়, গৌরবের উচ্চতায় ওঠা যায়। সেলুলয়েডের ফিতের মতো মেঘালয়ের পাদদেশে শুয়ে থাকা যে শহর ফুলে ফুলে জেগে ওঠে, গানে গানে ঘুম যায় সেই সুনামগঞ্জকে আবিষ্কার করেছিলাম প্রেমের শহর বলে। ভালোবাসা ও কবিতার শহর বলে। অসংখ্য বাউল আর মরমি সাধকের লাখো অনুসারীকে চোখে রেখে চিত্রিত করেছিলাম গানের শহর বলে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শহরে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমরা বেড়ে উঠেছিলাম গভীর আত্মার বন্ধনে। সন্ধ্যা নামলে আলো-বাতাস বয়ে যাওয়া যে শহরের ধানক্ষেতে সবুজ ঢেউ খেলেছে, মধ্যরাতে কোকিল ডেকেছে, পাখির কূজনে ঘুম ভেঙেছে। শহরের বুকচিরে বহমান সুরমা, চারদিকে অসংখ্য হাওর বিল গাছগাছালি, আষাঢ়-শ্রাবণে কালোমেঘে ঢাকা আকাশ, মুষলধারে নেমে আসা বৃষ্টি টিনের ঘরে কাঁথা গায়ে ঘুমানোর সুখ আর পূর্ণিমা রাতে আকাশ ভেঙে নেমে আসা জোছনার জলের সঙ্গে খেলা, জল জোছনার শহরকে কী দারুণ কাব্যিক ও রোমান্টিক করে তুলেছিল! এখানেও প্রকৃতির সঙ্গে কৃষক মৎস্যজীবী বালু ও পাথর শ্রমিকদের ঘাম ঝরা সংগ্রাম রচিত হয়ে আছে। তবুও মানুষের মন বড়ই আবেগপ্রবণ। সহজ-সরল, নিরহংকারী, নিরাভরণ জীবন যার, তার মন তার মাটির মতো নরম, ঘাসের মতো সবুজ সেই মানুষদের একজন হিসেবে আমি সেই শহরের, সেই জনপদের কথাই বলেছি। আজ সেই শহর, সেই নদী ও সেই হাওরে দেশ-বিদেশের কত পর্যটক ঘুরতে যান দেখতে কতই না ভালো লাগে! একটি শহর ও তার প্রকৃতি আর মানুষকে সবখানে ছড়িয়েছি, এ আমার অনেক পাওয়া।

লালন সাঁইজির জীবন নিয়ে প্রখ্যাত লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মনের মানুষ উপন্যাস অবলম্বনে গৌতম ঘোষ যে সিনেমা বানান তার শুটিং হয়েছে টাঙ্গুয়ার হাওরে, তাহিরপুরে। জাদুকাটা নদী সেখানে আমাকেও টানে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে টানে পুণ্যতীর্থের পুণ্যস্নানে আর মুসলমানদের টানে সীমান্তের ওপারে শাহ আরেফিনের মাজারের ওরসে। এ সময় দুই সীমান্ত একাকার হয়ে যায়। সেই সুনামগঞ্জে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলেছিল আমার পূর্বপশ্চিমবিডিডটনিউজের নিখোঁজ রিপোর্টার উৎপল দাস। সোমবার এই লেখা যখন লিখছি তখন তার সতীর্থ, মাঠ দাপানো সংবাদকর্মীরা তার সন্ধান চেয়ে কারওয়ান বাজারে মুখে কালো কাপড় বেঁধে মোমবাতি প্রজ্ব্বলন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছেন। সবার আকুতি একটাই, উৎপল দাসের সন্ধান দিন। তাকে বাবা-মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিন।

বোকাসোকা, আবেগপ্রবণ কিছুটা খেপাটে ও পাগলাটে ধরনের বোহেমিয়ান টাইপের উৎপল দাস জগৎ সংসারের হিসাব-নিকাশ বুঝত না। পূর্বপশ্চিমবিডিডটনিউজের বার্তা অফিস যখন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় সেই তখন প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় আগে একদিন বার্তা সম্পাদক বিপুল হাসান আওয়ামী লীগ বিটের এই ছেলেটিকে আমার কাছে নিয়ে আসেন। অফিস ফাঁকি দেওয়া উৎপল কাজপাগল বলে সয়ে যেতাম। নিয়মে বাঁধা জীবনে সে অভ্যস্ত ছিল না। কিন্তু রাজনীতি থেকে খেলাধুলা, সেখান থেকে সিনেমাজগৎ সব কিছু নিয়েই রিপোর্ট করতে চাইত। তাকে একবার বিদায়ও করে দিয়েছিলাম। করপোরেট সংস্কৃতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে কিছুটা জেদ কিছুটা অভিমান নিয়ে নিউজ পোর্টাল করেছিলাম। গত্বাঁধা চাকরিতে আর ফিরব না বলে অনেক বড় টিম নিয়ে অনেক অনেক স্বপ্ন নিয়ে একুশ শতকের কান সংবাদ প্রধান জেনে সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে নিউজ পোর্টাল করেছিলাম। প্রিন্ট মিডিয়ায় অভিজ্ঞ হলেও অনলাইন সাংবাদিকতায় আমি ছিলাম আনকোরা। যারা শুরুতে যুক্ত হয়েছিলেন তাদের অনেকেই বড় বড় কথা বলেছিলেন। বুকভরা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ঠকে যাওয়া চিত্রগুলো সয়ে গেছি। মাঝখানে সব সঞ্চয় ও ধারদেনায় নিঃস্ব হয়েছি।

এটিকে সুশৃঙ্খল নিয়মে বাধা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়ে আসা খুজিস্তা নূর-ই-নাহারিন মুন্নি। উৎপল সবার ভালোবাসা কাড়তে জানত। মুন্নিরও মাতৃস্নেহ কেড়েছিল বলে তিনিই তাকে আবার পূর্ব-পশ্চিমে ফিরিয়ে আনেন। উৎপল সদাচঞ্চল, অস্থির। সে বলেছিল, লালন সাঁইজির তিরোধান দিবস উপলক্ষে লালন স্মরণোৎসবে যোগ দিতে ছুটি দেন। তিন দিনের জন্য যাব। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার লালনের আখড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে অনেকবার গিয়েছি। ওখানে যাওয়ার লোভ এখনো আমার হয়। তাকে আটকাতে বলেছিলাম, আমিও যাব। থাক একসঙ্গে যাই। সুনামগঞ্জেও যেতে চেয়েছিল। তার আবেগ নিয়ন্ত্রণে বলেছিলাম, এক সপ্তাহের জন্য যাবি।

১০ অক্টোবর অফিস থেকে বের হওয়ার পর উৎপলের কোনো খোঁজ নেই। প্রথম কদিন ভেবেছি হয়তো কোথাও হুটহাট করে চলে গেছে। কিন্তু কয়েক দিন পর অফিস থেকে তার ঠিকানায় চিঠি দেওয়া হয়, লোক পাঠানো হয়। তার খবর নেই! একপর্যায়ে তার বন্ধুবান্ধবসহ সবাই যখন বলেন, খোঁজ নেই। তখন আমরা অস্থির বিচলিত হই। আমি তখন দিল্লি। অফিসকে বলি থানায় জিডি করতে। সম্পাদক খুজিস্তা নূর-ই-নাহারিন মুন্নি যুগ্ম বার্তা সম্পাদক শাহনেওয়াজ সুমনকে নিয়ে মতিঝিল থানায় জিডি করেন। পরদিন উৎপলের বাবা চিত্তরঞ্জন দাস ঢাকায় ছুটে আসেন। তিনিও আরেকটি জিডি করেন। দিল্লি থেকে ফিরেই ঢাকার পুলিশ কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়ার সঙ্গে কথা বলি। তিনি আন্তরিকতার ঘাটতি দেখান না। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি স্নেহভাজন শাবান মাহমুদ ও সাধারণ সম্পাদক সোহেল হায়দার চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলি। তারাও আন্তরিকতার হাত বাড়ান। শাবান মাহমুদসহ র‌্যাবের মহাপরিচালক পুলিশের দক্ষ সিনিয়র অফিসার বেনজীর আহমেদের সঙ্গে কথা বলি। তিনি তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ নেন। উৎপলের বাবা নরসিংদীর গ্রামের বাড়িতে স্ত্রী, পুত্র-কন্যাদের নিয়ে থাকেন। একজন সহজ-সরল মানুষ, অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক চিত্তরঞ্জন দাস। উৎপলের বন্ধুদের নিয়ে সমকালের সংবাদকর্মী রাজীব আহমদ বন্ধুত্বের নজির সৃষ্টি করেন। এই হূদয়বান বন্ধু উৎপলের সন্ধানে সহকর্মীদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। উৎপলের বাবা পুত্র-কন্যাদের নিয়ে ঢাকায় এলে আমরা যৌথ সংবাদ সম্মেলন করি। সংবাদ সম্মেলনে আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়। তারা বুকভরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। আমাদের সবার বুকের পাঁজর ভাঙতে থাকে আর অসহায়ত্ব বোধ করতে থাকি। সেখান থেকে তিনি আমাদের সহকর্মীদের নিয়ে র‌্যাব সদর দফতরে চলে যান। র‌্যাব কর্মকর্তা মেজর মাহমুদ হাসান তারিক উৎপলের বাবা, ভাইবোনের সঙ্গে আন্তরিকভাবে কথা বলেন। আশ্বাস দিয়ে বলেন, বাড়ি চলে যান। ইতিমধ্যে উৎপলের মোবাইল থেকে কে বা কারা ফোন করে তার পিতার কাছে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ চায়। উৎপলের ফেসবুক বান্ধবীর কাছে তার দেওয়া স্ট্যাটাস ইনবক্সে পাঠায়।

পুরো বিষয় রহস্যময় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুলের সঙ্গে নিখোঁজ উৎপলের বিষয় নিয়ে আলোচনা হলে তিনিও আন্তরিকতার হাত বাড়ান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দসহ দেখা করার কথা বলেছেন। মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। আমাদের সহকর্মী উম্মুল ওয়ারা সুইটিসহ অনেক মাঠের রিপোর্টার সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। গণমাধ্যম প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে আমাদের উদ্দেশ করে এই বলে তীর্যক মন্তব্য করেছেন যে, বিভিন্ন সময় গুম ও নিখোঁজের বিষয়ে সোচ্চার হলে আজকে এ ঘটনা ঘটত না। তাদের বিনয়ের সঙ্গে বলার চেষ্টা করেছি সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, সালাম খান, জহুর চৌধুরীদের উত্তরাধিকারিত্ব বহন করে অনিশ্চয়তার এ পেশায় যুক্ত হয়েছিলাম। পূর্বসূরিদের শেখানো সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলার চেষ্টা করেছি; প্রতিটি অসাংবিধানিক বেআইনি ঘটনার প্রতিবাদের চেষ্টা করেছি। বিনাবিচারে হত্যা, গুম-খুনের সমালোচনায় মুখর থেকেছি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম আমি, সে কখনও করে না বঞ্চনা। ’ এটিকেই শুধু লালন করিনি, ফরাসি দার্শনিক ভলতিয়ারের সেই উক্তিকেও বিশ্বাস করেছি— ‘আমি তোমার মতের সঙ্গে একমত না-ও হতে পারি। কিন্তু তোমার মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতে পারি। ’ মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতে পারি আর না-ই পারি যে কোনো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পারি। এ পেশার সঙ্গে জীবন জড়ানোর পর অনেক সহকর্মী বন্ধুকে বিদেশের নিরাপদ জীবন বেছে নিতে দেখেছি, সেখান থেকে ফেসবুক স্ট্যাটাসে তাদের বিপ্লবী কথাবার্তাও হরহামেশাই দেখি। কিন্তু অহংকারের সঙ্গে এটা বলতেই পারি, আমার প্রিয় স্বদেশ ছেড়ে যাইনি, যাব না। গোটা সমাজ ও দেশ রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। দুই নয়নে কেউ কিছু দেখছেন না। অন্ধের মতো দলদাস, মোসাহেব ও সুবিধাবাদীদের আস্ফাালন দিনের পর দিন চলছে। সেই সময়ে যারা আমাদের রাজপথে রেখে বিদেশের নিরাপদ জীবন নিয়েছিলেন সেখানে সুবিধা করতে না পেরে তাদের অনেকেই গণতন্ত্রের জমানায় অগাধ বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন। বিদেশে বসে যারা বাড়ি কেনাবেচার দালালি করতেন, খেয়ে না খেয়ে থাকতেন তারাও অনেকে মিডিয়া থেকে ব্যাংক মালিক হয়েছেন। দেখি আর ভাবি কান পেতে শুনি, ‘ঝিনুক নীরবে সহো/ ঝিনুক নীরবে সহো/ ঝিনুক নীরবে সহে যাও/ বুকেতে বিষের বালি/ মুখ বুজে হাসিতে মুক্তো ফলাও। ’ অকাল প্রয়াত কবি আবুল হাসানকে মনে পড়ে।

মাঝেমধ্যে অদ্ভুত হয়ে ভাবি যে, সমাজে শেয়ার কেলেঙ্কারির কুশীলবরা ৩২ লাখ বিনিয়োগকারীকে রিক্ত নিঃস্ব করে এক কোটি মানুষের আর্তনাদ শুনে তারা দেশে-বিদেশে যেখানেই থাক নিরাপদ থাকে, নিখোঁজ হয় না। নিখোঁজ হয়ে যায় আমাদের উৎপল দাসরা। গরিব মা-বাবার ছেলেটি। যে সমাজে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয় তার নেপথ্য নায়করা নিখোঁজ হয় না। তারা বহাল তবিয়তে সমাজে দাপটের সঙ্গে চলাফেরা করে। যে সমাজে অবাধ ব্যাংক লুট হয়ে যায় সেখানে লুটেরারা নিখোঁজ হয় না, নিরীহ সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি রাত গভীরে ঘরের ভিতর খুন হন, বছরের পর বছর গড়িয়ে যায়। খুনি ধরা পড়ে না। নৃশংস হত্যাকাণ্ড রহস্যময় থেকে যায়। তার মানে আমরা চাইছি না, কেউ নিখোঁজ হয়ে যাক। কেউ অপরাধ করে থাকলে তার বিচার হোক। আমরা চাইছি, সাগর-রুনি হত্যার বিচার। আমরা চাইছি, উৎপল ফিরে আসুক মায়ের কোলে। আমরা চাইছি, দেশের নিখোঁজ সব নাগরিকের সন্ধান। দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, আমলা, মধ্যস্বত্বভোগী, দালাল যে পেশায়ই থাকুক সমাজ যেন তাদের নিয়ন্ত্রণে। সব ভোগবিলাস ও সচ্ছল জীবন আর ক্ষমতা তাদের হাতের মুঠোয়। তারা নিখোঁজ হয় না। টানা ২২ দিন ধরে নিখোঁজ থেকে যায় উৎপল দাস। সোমবার ছিল তার জন্মদিন। মা তাকে পায়েস খাওয়াতে পারেননি, জ্ঞান হারিয়েছেন বার বার। বাবা তার নির্বাক, বাকরুদ্ধ হয়ে পথের দিকে তাকিয়ে থাকে উৎপল ফিরে না। কাঁদতে কাঁদতে বোনেরা প্রশ্ন করে, ভাইয়ের সঙ্গে কি মাকেও হারিয়ে ফেলব? তবুও উৎপল ফিরে আসে না!

সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের রক্তে ভেজা বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে সাংবিধানিকভাবে জনগণকে ক্ষমতার মালিক করা হলেও সেই জনগণ বরাবর উপেক্ষিত, অবহেলিত ক্ষমতাহীনই থেকেছে। জনগণের আবেগ-অনুভূতি, সম্ভ্রমের নিরাপত্তা রাষ্ট্র দিতে পারেনি। এমনকি কতবার আমরা আমাদের তারুণ্যে স্লোগান তুলেছি, প্রেম ও দ্রোহের কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতো স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই। কিন্তু আমরা স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি পাইনি।

উৎপল দাস এমন কোনো রিপোর্ট করেননি যে সরকার বা বিরোধী দল অথবা কোনো রাজনৈতিক শক্তি তার ওপর বিক্ষুব্ধ হতে পারে। এমন কোনো রিপোর্ট করেননি যাতে কোনো মহল তার ওপর চড়াও হতে পারে। এমন কোনো রিপোর্ট করেননি যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তাকে তামাদি করে দিতে পারেন। উৎপল অতি গরিব পরিবারের সন্তান, কোনো ধনাঢ্য ব্যক্তির আদরের দুলাল নয় যে তাকে কেউ অপহরণ করে বড় অঙ্কের মুক্তিপণ নিতে পারে। কারও দিকে আমাদের কোনো সন্দেহের আঙ্গুল নেই। তার নিরীহ পরিবারও কারও দিকে সন্দেহের তীর ছোড়েনি। তার পরিবার ও গোটা গণমাধ্যম এবং আমরা একটিই আকুতি জানাচ্ছি, উৎপলের সন্ধান দিন। উৎপলকে তার বাবা-মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিন। তাকে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দিন।

একটি নিরীহ সাধারণ পরিবার থেকে আসা সংবাদকর্মী উৎপল দাস নিখোঁজ থেকে গেলে রাষ্ট্র তার দায় এড়াতে পারে না। আজ উৎপল নিখোঁজ হয়ে গেলে কাল আমি নিখোঁজ হব না তার গ্যারান্টি কোথায়? পরশু আপনি নিখোঁজ হবেন না সেটি ভাবলেন কী করে? আমি আমার অকাল মৃত্যুকে মেনে নিতে পারি, স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই। আমিও চাই আমি মরে গেলে আমার সতীর্থদের শেষ দর্শনে মরদেহ একসময়ের সেকেন্ড হোম খ্যাত জাতীয় প্রেস ক্লাব হয়ে আমার জন্মের শহর সুনামগঞ্জে চলে যাবে। সেখানে আমার মা-বাবা, ভাই পূর্ব পুরুষদের সঙ্গে আমিও চিরনিদ্রায় শায়িত হতে চাই। গাছগাছালি ঘেরা পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শুয়ে বিদ্রোহের কবি নজরুলের মতো যেন সামনে থাকা বাপ-চাচাদের প্রতিষ্ঠা করা প্রাচীন মসজিদের মুয়াজ্জিনের সুরেলা কণ্ঠের আজান শুনতে পাই। আমি নিখোঁজ হলে, মরে গেলে আমার লাশটি বাড়ি পাঠিয়ে দিও। দেশ ও মানুষের কাছে, বন্ধু ও স্বজনদের কাছে এ আমার করুণ আকুতি। তার আগে ফিরে চাই উৎপলকে। কবির ভাষায়, ‘নিবেদন করি আমার ভালোবাসার স্বীকৃতি চাই, স্বীকৃতি দে। ’ আমাদের স্নেহের উৎপলকে ফিরে চাই, ফিরিয়ে দাও।

[লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।]

Print Friendly, PDF & Email
Loading...
Print Friendly, PDF & Email

Comments are closed

diamond world
Rupali bank ltd
exim bank
Lastnewsbd.com
পেপার কর্ণার
Lastnewsbd.com
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন >

সংলাপ সফল হবে বলে আপনি মনে করেন ?

ফলাফল দেখুন

Loading ... Loading ...
আর্কাইভ
মতামত
মাইনাস টু ফর্মুলা,খালেদা-তারেকবিহীন বিএনপি!
।।মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু ।। সামরিক বাহিনীর প্র...
বিস্তারিত
সাক্ষাৎকার
সফল হওয়ার গল্প, সাফল্যের পথ
।।আলীমুজ্জামান হারুন।। ১৯৮১ সালে যখন নিটল মটরসে...
বিস্তারিত
জেলার খবর
Rangpur

    রংপুরের খবর

  • শৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে দল ও নির্বাচনী এলাকাকে এগিয়ে নিতে চাই: সেলিনা জাহান লিটা
  • ডিমলায় ইউএনও'র হস্তক্ষেপে বাল্য বিয়ে থেকে রক্ষা পেলো খুশি
  • ডিমলায় নসিমন চাপায় বৃদ্ধা নিহত

সংলাপ সফল হবে বলে আপনি মনে করেন ?

  • মতামত নাই (15%, ২ Votes)
  • হা (15%, ২ Votes)
  • না (70%, ৯ Votes)

Total Voters: ১৩

আপনি কি মনে করেন যে কোন পরিস্থিতিতে বিএনপি নির্বাচন করবে ?

  • মতামত নাই (7%, ৭ Votes)
  • না (23%, ২৩ Votes)
  • হ্যা (70%, ৭১ Votes)

Total Voters: ১০১

অাপনি কি কোটা সংস্কারের পক্ষে ?

  • মতামত নেই (3%, ১ Votes)
  • না (8%, ৩ Votes)
  • হ্যা (89%, ৩৩ Votes)

Total Voters: ৩৭

খালেদা জিয়ার মামলা লড়তে বিদেশি আইনজীবীর কোন প্রয়োজন নেই' বিএনপি নেতা আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেনের সাথে - আপনিও কি একমত ?

  • মতামত নাই (9%, ১ Votes)
  • না (27%, ৩ Votes)
  • হ্যা (64%, ৭ Votes)

Total Voters: ১১

আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিদেশিদের কোনো উপদেশ বা পরামর্শের প্রয়োজন নেই বলে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের মন্তব্য যৌক্তিক বলে মনে করেন কি?

  • মতামত নাই (7%, ১ Votes)
  • হ্যা (20%, ৩ Votes)
  • না (73%, ১১ Votes)

Total Voters: ১৫

এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব) অলি আহমাদ বলেন, এরশাদকে খুশি করতে বেগম জিয়াকে নাজিমউদ্দিন রোডের জেলখানায় নেয়া হয়েছে। আপনিও কি তা-ই মনে করেন?

  • মতামত নাই (8%, ৫ Votes)
  • না (27%, ১৬ Votes)
  • হ্যা (65%, ৩৮ Votes)

Total Voters: ৫৯

আপনি কি মনে করেন আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহন করবে ?

  • না (13%, ৫৪ Votes)
  • হ্যা (87%, ৩৬২ Votes)

Total Voters: ৪১৬

আপনি কি মনে করেন বিএনপির‘র সহায়ক সরকারের রুপরেখা আদায় করা আন্দোলন ছাড়া সম্ভব ?

  • হ্যা (32%, ৪৫ Votes)
  • না (68%, ৯৫ Votes)

Total Voters: ১৪০

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের বিষয়টি সম্পূর্ণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপরে নির্ভরশীল, এ বিষয়ে অাপনার মন্তব্য কি ?

  • মন্তব্য নাই (7%, ২ Votes)
  • হ্যা (26%, ৭ Votes)
  • না (67%, ১৮ Votes)

Total Voters: ২৭

আপনি কি মনে করেন নির্ধারিত সময়ের আগে আগাম নির্বাচন হবে?

  • মন্তব্য নাই (7%, ১০ Votes)
  • হ্যা (31%, ৪৬ Votes)
  • না (62%, ৯১ Votes)

Total Voters: ১৪৭

হেফাজতকে বড় রাজনৈতিক দল বানানোর চেষ্টা চলছে বলে মন্তব্য করেছেন নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। আপনি কি তার সাথে একমত?

  • মতামত নাই (10%, ৩ Votes)
  • না (34%, ১০ Votes)
  • হ্যা (56%, ১৬ Votes)

Total Voters: ২৯

“আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে দেশে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা কমে যাবে ”সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের সাথে কি অাপনি একমত ?

  • মতামত নাই (9%, ৩ Votes)
  • না (32%, ১১ Votes)
  • হ্যা (59%, ২০ Votes)

Total Voters: ৩৪

আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহার করে যারা সংগঠনের নামে দোকান খুলে বসেছে, তাদের ধরে ধরে পুলিশে দিতে হবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এমন বক্তব্যের আপনার প্রতিক্রিয়া কি ?

  • মতামত নাই (7%, ৩ Votes)
  • না (10%, ৪ Votes)
  • হ্যা (83%, ৩৫ Votes)

Total Voters: ৪২

ড্রাইভাররা কি আইনের উর্ধে ?

  • মতামত নাই (2%, ১ Votes)
  • হ্যা (14%, ৭ Votes)
  • না (84%, ৪৩ Votes)

Total Voters: ৫১

সার্চ কমিটিতে রাজনৈতিক দলের কেউ নেই- ওবায়দুল কাদেরের এ বক্তব্য সমর্থন করেন কি?

  • মতামত নাই (5%, ৩ Votes)
  • হ্যা (31%, ১৭ Votes)
  • না (64%, ৩৫ Votes)

Total Voters: ৫৫

ইসি গঠন নিয়ে রস্ট্রপতির সংলাপ রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক মাত্রা আসবে বলে কি আপনি মনে করেন ?

  • মতামত নাই (8%, ৭ Votes)
  • না (34%, ৩২ Votes)
  • হ্যা (58%, ৫৪ Votes)

Total Voters: ৯৩

Do you support DD?

  • yes (0%, ০ Votes)
  • no (100%, ০ Votes)

Total Voters:

How Is My Site?

  • Excellent (0%, ০ Votes)
  • Bad (0%, ০ Votes)
  • Can Be Improved (0%, ০ Votes)
  • No Comments (0%, ০ Votes)
  • Good (100%, ০ Votes)

Total Voters: