Monday, 11th September , 2017, 09:14 am,BDST
Print Friendly, PDF & Email

এ সাফল্য সবার



।। ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ ।।

বাংলাদেশের পয়তাল্লিশ বছর বয়ঃক্রমকালে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি নীতিনির্ধারক সরকার নেতৃত্বে এসেছে। প্রত্যেকের কিছু না কিছু অবদানে বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এই পর্যায়ে পৌঁছিয়েছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারীদের সংখ্যা কমছে, দারিদ্র্যবিমোচন হয়েছে বা হচ্ছে। শিশু মৃত্যুর হার কমেছে, মানুষের মাথাপিছু আয়ের পরিস্থিতিতে উন্নতি সাধিত হয়েছে। বাজেটের বপু বেড়েছে এডিপির আকার বেড়েছে।

এখানে স্বভাবত প্রশ্ন এসেছে অর্থনীতির এই উন্নয়নে সরকারসমূহের একক কৃতিত্ব কতখানি। এসব সাফল্যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সৃজনশীলতা, নির্ভরযোগ্যতা, সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার ভূমিকা বেশি না আমজনতার অর্থনীতির স্বয়ংক্রিয় স্বচ্ছ সলিলা শক্তির বলে এটি বেড়েছে। এটাও দেখার বিষয় যে পরিস্থিতি এমন হয়েছে কিনা আমজনতার নিজস্ব উদ্ভাবন প্রয়াসে অর্জিত সাফল্য বরং নীতিনির্ধারকের নিজেদের দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি, ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের দ্বারা বরং বাঞ্ছিত উন্নয়ন অভিযাত্রা বাধাগ্রস্ত কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নাগরিকের শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন প্রয়াসে তাদের কর্ম উন্মাদনা ও প্রেরণায় ক্ষমতালোভী দুর্নীতিদগ্ধ রাজনৈতিক অভিলাস বাধা সৃষ্টি করেছে কিনা কিংবা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানসমূহ দলীয় স্বার্থে ব্যবহৃত হয়ে নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও সেবা প্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত কিংবা বিড়ম্বনাদায়ক হয়েছে কিনা।

 

সাম্প্রতিক এক গবেষণা হিসাবে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ ও অর্থনীতিতে কর ডিজিপির রেশিও কাক্সিক্ষত সাধারণ মাত্রার (জিডিপির ১৫/১৬ শতাংশ) চাইতে যথেষ্ট কম। বর্তমানে কর জিডিপি রেশিও ১০/১১ এর মধ্যে ঘোরাফেরা করছে অর্থাৎ জিডিপির ৫/৬ শতাংশ কর আওতার বাইরে বা রাজস্ব অনাহরিত থেকে যাচ্ছে। বলাবাহুল্য প্রতিবছর জাতীয় বাজেটে জিডিপির ৪/৫ ভাগ পরিমাণ অর্থই ঘাটতি হিসেবে প্রাক্কলিত হতে হচ্ছে এবং এ ঘাটতি পরিমাণ অর্থ দেশি-বিদেশি ঋণ নিয়েই মূলত উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়িত হয়। অর্থাৎ দেশে জিডিপির আকার অনুপাতে যথাপরিমাণ ন্যায্য কর রাজস্ব অর্জিত হলে ঘাটতি বাজেট হয় না এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে ব্যাংক ঋণ গ্রহণ কিংবা নানান শর্তসাপেক্ষে বিদেশের কাছে হাত পাততে হয় না।

গভীর অভিনিবেশ সহকারে বিচার বিশে¬ষণের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়Ñ কেন ন্যায্য কর রাজস্ব আহরিত হয় না বা হচ্ছে না, কারা করনেটের বাইরে এবং তাদেরকে কর নেটের আনার পথে প্রতিবন্ধকতা ও সমস্যা কোথায়? বিভিন্ন কৌনিক দৃষ্টিতে পরীক্ষা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে দেশ, সমাজ ও প্রশাসন কর রাজস্ব সুষমকরণের পথে স্বচ্ছতার ন্যায়ানুগতার, পক্ষপাতহীন পদক্ষেপ নিতে অপারগ হয়েছে বা হচ্ছে। কর প্রদানে আহরণে, এমনকি কর রেয়াত বা অব্যাহতি প্রাপ্তিতে অন্তর্নিহিত অপারগতা বা দুর্বলতা রয়েছে। সাধারণ ও অসাধারণ করদাতায় অসম বিভক্ত সমাজে অসাধারণ করদাতারা শুধু একদাগে যে কর ফাকি দেয় সহস্র সাধারণ করদাতার ওপর তার চাপ পড়ে। বড় করদাতারা নীতিনির্ধারকের প্রশ্রয়ে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগে থাকলে কর প্রদান ও আহরণের সংস্কৃতি সুস্থ ও সাবলীল হতে পারে না।

নীতিনির্ধারকদের সিংহভাগ অংশ বৃহৎ করদাতা হলে ক্ষমতার বলয়ে বসবাসকারী হিসেবে রেয়াত ও ছাড় গ্রহণের মাধ্যমে ব্যাপক কর রাজস্ব রাষ্ট্রের হাতছাড়া হয়ে যায়। যথাযথ কর রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা হয় না। অথবা কথাটি এভাবে ঘুরিয়ে বলা যায় নীতিনির্ধারক নেতৃত্বের যে বলিষ্ঠ কমিটমেন্ট দরকার কর রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যে, যে এনফোর্সমেন্ট, যে সুষম পরিবেশ, যে পক্ষপাতহীন আচরণ, যে দৃঢ়চিত্ত মনোভাবের প্রয়োজন তা যেন থেকেও থাকে না। আইনসভায় যে অর্থবিল উত্থাপিত ও গৃহীত হয় সেখানে পরীক্ষা পর্যালোচনাÑ উত্তর ছাটাই প্রস্তাব পেশের কিংবা বিভিন্ন গঠনমূলক মতপ্রকাশ বা প্রস্তাবনা পেশের উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান ব্যবস্থায় যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়। ফলে ফিসকেল মেজারসগুলো যা যা যেভাবে উত্থাপিত হয় তাই গৃহীত হয়। মূল বাজেটে আয়-ব্যয়ে প্রাক্কলিত বরাদ্দ যথাযথ অর্জিত হচ্ছে কিনা তার জবাবদিহিকরণের সুযোগ সেখানে অনুপস্থিত। সামষ্টিক অর্থনেতিক ব্যবস্থাপনায় রাজস্ব আয় ও ব্যয় উভয় ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও জবাবাদিহিতা নিশ্চিতকরণের অনিবার্যতা অনস্বীকার্য। কর রাজস্ব প্রদানের বিপরীতে রাষ্ট্রের কাছ থেকে পুনর্বণ্টন প্রক্রিয়ায় নাগরিক সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিষয়টি সুনিশ্চিতকরণ কর প্রদানে নাগরিকদের দায়িত্বশীল হতে উদ্বুদ্ধকরণের জন্য অপরিহার্য।

 

আরেক পর্যালোচনায় দেখা গিয়েছে মধ্যম আয়ের পথযাত্রী দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি দুই ডিজিটে উপনীত হওয়ার উপযুক্ত উৎপাদন, বিপণন, সেবা, নির্মাণ পরিবেশ সবই বিদ্যমান সত্ত্বেও জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসাব ৬-৭ এর মধ্যে আটকা থাকছে। নানান কারণে প্রায় দু থেকে তিন শতাংশ অর্থনৈতিক কর্মকা- জিডিপিতে অবদান রাখতে পারছে না বা যথাযথ হিসাবভুক্ত হতে পারছে না। অদূরদর্শী কর্মযোজনা ও সামষ্টিক আর্থিক অব্যবস্থাপনা, অপচয় অপব্যয় আত্মসাতকৃত কর্মসূচির দ্বারা মোটা অংকের অর্থ উৎপাদন, বিপণন ও সরবরাহসহ অবকাঠামো নির্মাণসহ সকল সহযোগী খাতে অপব্যয়িত হচ্ছে। দুর্নীতি হচ্ছে। অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। সীমান্ত বাণিজ্যে চোরা কারবারে, ইনফর্মাল ট্রেডে আমদানি রপ্তানি ওভার/আন্ডার ইনভয়েসিং এ দ্বারা, ইনফর্মাল রেভিনিউ রেন্টসিকিং এর মাধ্যমে নানানভাবে সমৃদ্ধ অর্থনীতির সৌভাগ্যের ওপর ভাগ বসানো হচ্ছে। বিনা প্রতিকারে ব্যাংকের অর্থ লুটপাট হচ্ছে, আত্মসাতসহ নানান প্রকার আর্থিক কেলেঙ্কারিতে মানিমার্কেটের প্রতি আস্থা বিনষ্ট হচ্ছে, পুঁজিবাজারে পুঁজি প্রবাহ কমছে। পণ্য সরবরাহে চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেশন ব্যবসা-বাণিজ্যে টেন্ডারবাজি সবই ব্যয় বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি সবকিছু বাবদ যে অতিরিক্ত অর্থের অপচয় হচ্ছে তা যদি জিডিপিতে যথাযথভাবে অবদান রাখতে পারত (অর্থাৎ ব্যায়িত অর্থ দ্বারা গুডস অ্যান্ড সার্ভিস প্রডিউস হতো) তা জিডিপিকে দুই ডিজিটে নিয়ে যাওয়ার জন্য হতো যথেষ্ট।

অতি সম্ভাবনাময় এই অর্থনীতির এই অগ্রযাত্রায় বাধা সৃষ্টির নানান সমস্যা সীমাবদ্ধতাকে নিয়ন্ত্রণ দূরিভূতকরণের দায়িত্ব যে নীতিনির্ধারক নেতৃত্বের তাদের সফলতা ও ব্যর্থতার বিষয়টি এখন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পারস্পরিক দোষারোপের অবয়বে অর্থনীতির যে ক্ষয়-ক্ষতি সাধন তা কিন্তু কোনো অংশে কম নয়। কোনো ঘটনার কারণ (পধঁংব) ঘটিয়ে সেই ঘটনার ফলাফলের (বভভবপঃ) ওপর দোষ চাপালেই ক্ষয়-ক্ষতির দায় দায়িত্ব নির্ধারণ শেষ হয় না। ঘটনার কারণ ও কার্যকরণও পর্যালোচনাযোগ্য। দলীয় বা কোটারিগত, শ্রেণিগত পক্ষপাতিত্বে অর্থনীতিতে যে ভারসাম্যহীন পরিবেশ সৃষ্টি হয় তা অবশ্যই অনুধাবনীয়।

 

সাম্প্রতিককালে দেখা গিয়েছে জনগণ নিজেদের দিন এনে দিন খাওয়ার টানাপড়েনের অর্থনীতিতে অতিশয় আগ্রহী ও মনোযোগী হতে বাধ্য হয়েছে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ না নেওয়ার বিপরীতে। রাজনীতিকে অর্থনীতির প্রতিপক্ষ প্রতিপন্নকরণের পথ এড়াবার স্বার্থে নীতিনির্ধারকের নিজেরই দায়িত্বশীল হওয়ার যৌক্তিকতা হারিয়ে যায়নি, যেতে পারে না।

লেখক: সরকারের সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

Print Friendly, PDF & Email

Comments are closed

diamond world
Rupali bank ltd
exim bank
Lastnewsbd.com
পেপার কর্ণার
Lastnewsbd.com
অনলাইন জরিপ
আজকের প্রশ্ন >

আপনি কি মনে করেন নির্ধারিত সময়ের আগে আগাম নির্বাচন হবে?

ফলাফল দেখুন

Loading ... Loading ...
আর্কাইভ
সেপ্টেম্বর ২০১৭
শুক্র শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহস্পতি
« আগস্ট   অক্টো. »
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
মতামত
জন্মদিনের ভাবনা: শেখ হাসিনার নোবেল পুরস্কারের দরকার নেই
।। আজিজুল ইসলাম ভূঁইয়া।। আজ ২৮ সেপ্টেম্বর। জননে...
বিস্তারিত
সাক্ষাৎকার
সফল হওয়ার গল্প, সাফল্যের পথ
।।আলীমুজ্জামান হারুন।। ১৯৮১ সালে যখন নিটল মটরসে...
বিস্তারিত
জেলার খবর
Rangpur

    রংপুরের খবর

  • চুরির অপবাদ সইতে না পেরে ট্রেনের নিছে ঝাপ দিয়ে গৃহবধুর আত্মহত্যা
  • অর্থের অভাবে কী ভেঙ্গে যাবে সঞ্জিতের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন !
  • বন্ধ হয়ে যেতে পারে একতা প্রতিবন্ধী উন্নয়ন স্কুল-পুনর্বাসন কেন্দ্রটি
  • পার্বতীপুরে কৃষকের ধানক্ষেতে দুর্বৃত্তের বিষ
  • দিনাজপুরে ২০০ বোতল ফেনসিডিলসহ আটক ১

আপনি কি মনে করেন নির্ধারিত সময়ের আগে আগাম নির্বাচন হবে?

  • মন্তব্য নাই (7%, ১০ Votes)
  • হ্যা (31%, ৪৬ Votes)
  • না (62%, ৯১ Votes)

Total Voters: ১৪৭

হেফাজতকে বড় রাজনৈতিক দল বানানোর চেষ্টা চলছে বলে মন্তব্য করেছেন নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। আপনি কি তার সাথে একমত?

  • মতামত নাই (10%, ৩ Votes)
  • না (34%, ১০ Votes)
  • হ্যা (56%, ১৬ Votes)

Total Voters: ২৯

“আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে দেশে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা কমে যাবে ”সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের সাথে কি অাপনি একমত ?

  • মতামত নাই (9%, ৩ Votes)
  • না (32%, ১১ Votes)
  • হ্যা (59%, ২০ Votes)

Total Voters: ৩৪

আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহার করে যারা সংগঠনের নামে দোকান খুলে বসেছে, তাদের ধরে ধরে পুলিশে দিতে হবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এমন বক্তব্যের আপনার প্রতিক্রিয়া কি ?

  • মতামত নাই (7%, ৩ Votes)
  • না (10%, ৪ Votes)
  • হ্যা (83%, ৩৫ Votes)

Total Voters: ৪২

ড্রাইভাররা কি আইনের উর্ধে ?

  • মতামত নাই (2%, ১ Votes)
  • হ্যা (14%, ৭ Votes)
  • না (84%, ৪৩ Votes)

Total Voters: ৫১

সার্চ কমিটিতে রাজনৈতিক দলের কেউ নেই- ওবায়দুল কাদেরের এ বক্তব্য সমর্থন করেন কি?

  • মতামত নাই (5%, ৩ Votes)
  • হ্যা (31%, ১৭ Votes)
  • না (64%, ৩৫ Votes)

Total Voters: ৫৫

ইসি গঠন নিয়ে রস্ট্রপতির সংলাপ রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক মাত্রা আসবে বলে কি আপনি মনে করেন ?

  • মতামত নাই (8%, ৭ Votes)
  • না (34%, ৩২ Votes)
  • হ্যা (58%, ৫৪ Votes)

Total Voters: ৯৩

Do you support DD?

  • yes (0%, ০ Votes)
  • no (100%, ০ Votes)

Total Voters:

How Is My Site?

  • Excellent (0%, ০ Votes)
  • Bad (0%, ০ Votes)
  • Can Be Improved (0%, ০ Votes)
  • No Comments (0%, ০ Votes)
  • Good (100%, ০ Votes)

Total Voters: